ভারতের ব্যস্ত শহরগুলোতে হর্নের শব্দ এখন শুধু বিরক্তির কারণ নয়, বরং তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে। রাজধানী দিল্লির পুরোনো এলাকা চাঁদনি চকে এক ছোট দোকানে হর্ন বিক্রি ও মেরামতের ব্যবসা জমজমাট। দোকানির দাবি, মানুষ দামি গাড়ি বা মোটরসাইকেল কিনলেও কিছুদিন পর হর্ন বদলাতে চায়, কারণ সেটি গাড়ির সঙ্গে মানানসই মনে হয় না। এই চাহিদাই ইঙ্গিত দেয়, শহরের রাস্তায় হর্ন ব্যবহারের মাত্রা কতটা বেড়েছে।
শহরের শব্দমাত্রা উদ্বেগজনক
শহরের রাস্তায় পা রাখলেই বোঝা যায় শব্দদূষণের প্রকৃত চিত্র। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের শহরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চ শব্দমাত্রার মধ্যে রয়েছে। দিল্লির রাস্তায় গড় শব্দমাত্রা প্রায় ৭৫ ডেসিবেল, যা স্বাভাবিক নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এর বড় অংশই আসে যানবাহনের অবিরাম হর্ন থেকে।

স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব
শব্দদূষণ শুধু অস্বস্তি তৈরি করে না, বরং মানুষের শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। দেশে কোটি মানুষের শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার পেছনে শব্দদূষণ একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ফলে এটি একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে।
অর্থনীতিতেও ক্ষতির আশঙ্কা
শব্দদূষণের আর্থিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকলেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এর প্রভাব বড়। ইউরোপের হিসাব অনুযায়ী, শব্দদূষণের কারণে একটি দেশের মোট উৎপাদন প্রায় শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই প্রবণতা ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হলে এর প্রভাব হতে পারে ব্যাপক।

যানজট ও পরিকল্পনার অভাব
ভারতের শহরগুলোর অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই রাস্তায় ট্রাক, রিকশা, মোটরসাইকেল ও পথচারীরা একসঙ্গে চলাচল করে। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে হর্ন হয়ে উঠেছে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। মোড় নেওয়া, পথ ছাড়ার সংকেত দেওয়া কিংবা নিজের উপস্থিতি জানানোর জন্য চালকেরা প্রায় অবিরাম হর্ন বাজান। একটি বড় শহরে চালকেরা ঘণ্টায় শতাধিকবার হর্ন ব্যবহার করেন বলেও তথ্য রয়েছে।
পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের মতোই শব্দদূষণ নিয়েও জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যদিকে কিছু দেশে ইতোমধ্যে শব্দ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যেমন শব্দরোধী দেয়াল, উন্নত সড়ক প্রযুক্তি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার। কিন্তু ভারতে এখনো তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন সাধারণ মানুষ নিজেরাই এই সমস্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে। আপাতত সেই দাবি হারিয়ে যাচ্ছে শহরের কোলাহলের মধ্যেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















