পশ্চিমবঙ্গের শেষ দফার ভোট ঘনিয়ে আসতেই রাজ্যের রাজনীতিতে কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়—মতুয়া। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই গোষ্ঠীকে ঘিরেই এখন শাসক তৃণমূল কংগ্রেস ও প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির তীব্র প্রতিযোগিতা। সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠী একাধিক আসনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মতুয়াদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলায় মতুয়াদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের বহু আসনে তাদের ভোট নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ৫০টিরও বেশি বিধানসভা আসনে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে এই সম্প্রদায়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন ও ২০২৪ সালের পারফরম্যান্সে বিজেপির উত্থানের পেছনে মতুয়াদের সমর্থন বড় ভূমিকা রেখেছিল।
রাজনৈতিক তৎপরতা ও প্রচার
এই গুরুত্ব বুঝেই উভয় দল মতুয়াদের আকৃষ্ট করতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি ঠাকুরনগরে গিয়ে মতুয়া ধর্মীয় কেন্দ্রে প্রার্থনা করেছেন। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই এই এলাকায় পদযাত্রা করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন। এরপর তৃণমূল কর্মীরা বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতেও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নাগরিকত্ব ইস্যুতে অনিশ্চয়তা
তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ। অনেক মতুয়া ভোটার এই প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কিত। যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, সিএএ-এর মাধ্যমে পূর্ণ নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হবে, তবুও বাস্তবে নানা জটিলতা সামনে আসছে।
অনেকেই মনে করছেন, সিএএ আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করা কঠিন। আবার অনেকের প্রশ্ন—যখন তাদের ভোটার আইডি ও আধার কার্ড রয়েছে, তখন নতুন করে আবেদন কেন? এতে বিদ্যমান নথিগুলোর বৈধতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

আবেদন ও বাস্তব চিত্র
২০২৪ সালের মার্চে সিএএ-এর বিধি কার্যকর হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ হাজার আবেদনকারী নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এই ব্যবধান অনেকের মধ্যে সন্দেহ ও আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম
বঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী শিবির খোলা হয়েছে, যেখানে মানুষকে নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ঠাকুরনগরেও মতুয়া মহাসঙ্ঘের উদ্যোগে এমন সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় যেতে অনিচ্ছুক।
অভ্যন্তরীণ বিভাজন
মতুয়া সম্প্রদায়ের ভেতরেও রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। এক অংশ বিজেপির সঙ্গে যুক্ত, অন্য অংশ তৃণমূলের সঙ্গে। এই বিভাজনের পেছনে রয়েছে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, যা প্রয়াত নেত্রী বিনাপাণি দেবীর উত্তরাধিকার ঘিরে তৈরি হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
নামশূদ্র সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা মতুয়াদের মূল কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে। দেশভাগের পর ঠাকুরনগর হয়ে ওঠে তাদের প্রধান কেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকত্ব ও পরিচয় নিয়ে তাদের আন্দোলনও জোরদার হয়, যা এখন সরাসরি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে জাতভিত্তিক রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবে ততটা প্রভাবশালী না হলেও, গত কয়েক দশকে মতুয়া সম্প্রদায় একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নাগরিকত্ব প্রশ্ন এখন তাদের ভোটের আচরণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















