সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমে ধান ঘিরে গভীর সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদনে বাড়তি খরচ, শ্রমিক সংকট, বৈরী আবহাওয়া আর বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার শঙ্কা—সব মিলিয়ে চরম লোকসানে পড়েছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে এক মণ ধান উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে দেড় হাজার টাকার কাছাকাছি, সেখানে বাধ্য হয়ে সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়।
খরচ বাড়লেও দাম বাড়েনি
কৃষকদের অভিযোগ, সার, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে এক হাজার ১০০ থেকে ১,৬০০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু বাজারে সেই ধানের দাম মিলছে অনেক কম। ফলে প্রতি মণেই লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।

শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি
ধান কাটার সময় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রমিক পাওয়া। অনেক জায়গায় শ্রমিক পাওয়া গেলেও দিতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা মজুরি। একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ দুই মণ ধান কাটতে পারছেন, ফলে প্রতি মণ ধানে শ্রম খরচই দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা। এতে কৃষকের ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতি
এপ্রিলের শুরু থেকেই টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের অনেক জমি তলিয়ে গেছে। পাকা ও আধা-পাকা ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কাটা ধান শুকানোর আগেই বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ভেজা ধান কম দামে বিক্রি করছেন।
ফসল তুলতে পারছেন না কৃষক

অনেক কৃষক জানিয়েছেন, ক্ষেতের ধানই তাদের নগদ অর্থের উৎস। ধান কাটার মজুরি ও মাড়াই খরচ জোগাতে তারা কম দামে ধান বিক্রি করছেন। কেউ কেউ আবার শ্রমিকের অভাবে পাকা ধান মাঠেই রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা পরে পানিতে ডুবে যাচ্ছে।
উৎপাদন কম, ক্ষতির আশঙ্কা বেশি
এ বছর ফলনও কম হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা, দেরিতে চাষাবাদ শুরু এবং সেচ সংকটের কারণে উৎপাদন আশানুরূপ হয়নি। ফলে যেটুকু ধান পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও ঠিকমতো ঘরে তোলা যাচ্ছে না।
হাওরে বাড়ছে হতাশা

জেলার বিভিন্ন হাওরে ইতোমধ্যে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের চোখের সামনে ফসল নষ্ট হতে দেখে হতাশা ও অসহায়ত্ব বেড়ে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারের জরুরি সহায়তা না পেলে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বোরো আবাদ হয়েছে দুই লাখের বেশি হেক্টর জমিতে। তবে এখনো অর্ধেকের বেশি জমির ধান কাটা বাকি। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সহায়তার দাবি
কৃষকদের দাবি, দুর্যোগের সময় ভেজা ধান সরকারি উদ্যোগে কিনে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতেন না। একই সঙ্গে দ্রুত ধান কাটার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ধান ঘিরে এমন সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি কৃষকের জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ক্ষতি আরও গভীর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















