১০:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬

এআই নিয়ে আলোচনায় স্থায়িত্ব হারিয়ে যাচ্ছে

কয়েক দিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে কফি খেতে খেতে সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই আলোচনা এসে ঠেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই)। আশ্চর্যের কিছু নেই—আমি জাতিসংঘ সমর্থিত এআই বিশেষজ্ঞদের একটি দলের সমন্বয় করি, আর সে এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। সে বলল, “এটা ছাড়া চলেই না,” যেন বিদ্যুৎ বা পানির মতোই অপরিহার্য কিছু নিয়ে কথা বলছে।

আমার কাজের সূত্রেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কখনো ভেবেছ, এআই পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?” সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কোনো ধারণা নেই।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, সত্যি বলতে বেশিরভাগ সময় আমিও জানি না।

বড় কথা, কিন্তু হিসাব নেই
আমরা এআই নিয়ে বড় বড় শব্দ ব্যবহার করি—রূপান্তরমূলক, বিপ্লবী, বিশ্ব বদলে দেওয়া প্রযুক্তি। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। যেন এটি কোনো প্রাকৃতিক শক্তি, মানুষের তৈরি একটি ব্যবস্থা নয়।

কিন্তু এই সব আলোচনায় একটি শব্দ প্রায় অনুপস্থিত—স্থায়িত্ব। সহকর্মীরা ভবিষ্যতের কাজ নিয়ে তর্ক করেন, বন্ধুরা স্মার্টফোনের নতুন এআই ফিচার নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু স্থায়িত্বের কথা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

এই অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়িত্ব ছাড়া এআই নিয়ে আলোচনা করা মানে চুলা বন্ধ করার কথা না ভেবে রান্না শেখা। প্রথমে সব ঠিকঠাক মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে খরচ বাড়ে, তাপ জমে ওঠে, আর একসময় কিছু না কিছু পুড়তে শুরু করে। এআই ক্ষেত্রেও একই বিষয়। বড় বড় সিস্টেম চালাতে বিপুল শক্তি লাগে, মানবজাতির প্রায় সব লেখা দিয়ে এগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, এবং এগুলো এমন সমাজে ব্যবহৃত হয় যেখানে বৈষম্য রয়েছে। এসব উপেক্ষা করলে সমস্যা দূর হয় না, বরং পরে তা আরও বড় হয়ে সামনে আসে।

স্থায়িত্বের কেন্দ্রেই আসল পরিবর্তন
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পডকাস্ট সিরিজে আলোচনার মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—যখন স্থায়িত্বকে কেন্দ্রে রাখা হয়, তখন এআই শুধু আকর্ষণীয় প্রযুক্তি নয়, বাস্তব উন্নয়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড দাও বলেছেন, এআই মানেই বিশাল প্রযুক্তি নয়। ছোট বা মাঝারি আকারের এআই সিস্টেম, সাধারণ কম্পিউটার বা এমনকি অফলাইন ডিভাইস দিয়েও কাজ করা সম্ভব। এতে পরিবেশগত খরচও অনেক কম হয়। স্থানীয় তথ্য যেমন বাতাসের দিক, গাছের ধরন বা প্রাণীর শব্দ যুক্ত করলে এসব মডেল আরও কার্যকর হয়। তার মতে, এআই কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মিলেই তৈরি হলে এটি শক্তিশালী ও স্থায়ী হয়।

Sustainability in the AI World: Challenges, Opportunities & Way Forward

কমিউনিটির কণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখা
ফিলিপাইনের এআই উদ্যোগের সহ-প্রতিষ্ঠাতা লেই মোটিলা অন্য একটি দিক তুলে ধরেছেন। কমিউনিটি পর্যায়ে অনেক মূল্যবান ধারণা উঠে আসে, কিন্তু সেগুলো কাগজে লিখে ফাইলবন্দি হয়ে হারিয়ে যায়। তার মতে, এআইয়ের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করে কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া সম্ভব।

এই অভিজ্ঞতা আমার কাছেও পরিচিত। অসংখ্য ভালো ধারণা মিটিংয়ের নোটেই হারিয়ে যেতে দেখেছি। ধারণা হারিয়ে গেলে মানুষও হারিয়ে যায়। তাই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউকো ইতাতসু মনে করিয়ে দেন, এআই আমাদের সমাজ থেকেই শেখে—আর সেই সমাজ নিখুঁত নয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কি অসম্পূর্ণ সমাজকেই আবার তৈরি করতে চাই?” সতর্ক না হলে এআই বিদ্যমান সমস্যাগুলোই আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

নীতিমালা ও বাস্তবতার সংযোগ
এই অভিজ্ঞতাগুলো মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—স্থায়িত্ব বাদ দিলে এআই নিয়ে আলোচনা অনেকটাই ফাঁপা হয়ে যায়। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রযুক্তিকে স্থায়ী উন্নয়নের পথে রাখতে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার। এ লক্ষ্যে বৈশ্বিক ডিজিটাল চুক্তি একটি বড় পদক্ষেপ।

তবে নীতিমালা দিয়েই সব বদলানো যাবে না। অধিকাংশ মানুষ এআইকে বোঝে অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা দৈনন্দিন কথোপকথনের মাধ্যমে, কোনো রিপোর্ট পড়ে নয়।

তাই এআই নিয়ে নতুনভাবে কথা বলা জরুরি। পডকাস্ট, অনলাইন কনটেন্ট বা সামাজিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজ ভাষায় এই আলোচনা মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

বাস্তব প্রশ্ন, বাস্তব ভাবনা
স্থায়িত্ব ছাড়া এআই নিয়ে কথা বলা সহজ। আবার মানুষের প্রসঙ্গ বাদ দিয়েও স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা সহজ। কিন্তু এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে ভাবা কঠিন—তবু এখান থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।

প্রতিদিনের জীবনে আমরা অনেকেই এআইকে নীরবে ব্যবহার করি—ইমেইলের উত্তর দেওয়া, তথ্য খোঁজা, বিশ্লেষণ করা—সবকিছু সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে একটি প্রশ্ন জেগে ওঠে: এই সহজতার বিনিময়ে আমরা কী দিচ্ছি? আর শেষ পর্যন্ত এর মূল্য কে দেবে?

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলো শুরু হয় না গবেষণাগারে বা বড় সম্মেলনে। বরং এমন সাধারণ মুহূর্তেই শুরু হয়—এক কাপ কফির আড্ডায়, যখন একটি প্রশ্ন ভাবনার জন্ম দেয়। কারণ স্থায়িত্ব যদি আলোচনার বাইরে থাকে, তাহলে এআইয়ের প্রকৃত মূল্য একদিন সবাইকেই দিতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

এআই নিয়ে আলোচনায় স্থায়িত্ব হারিয়ে যাচ্ছে

০৮:০০:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

কয়েক দিন আগে এক বন্ধুর সঙ্গে কফি খেতে খেতে সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই আলোচনা এসে ঠেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই)। আশ্চর্যের কিছু নেই—আমি জাতিসংঘ সমর্থিত এআই বিশেষজ্ঞদের একটি দলের সমন্বয় করি, আর সে এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। সে বলল, “এটা ছাড়া চলেই না,” যেন বিদ্যুৎ বা পানির মতোই অপরিহার্য কিছু নিয়ে কথা বলছে।

আমার কাজের সূত্রেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি কখনো ভেবেছ, এআই পরিবেশের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?” সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কোনো ধারণা নেই।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, সত্যি বলতে বেশিরভাগ সময় আমিও জানি না।

বড় কথা, কিন্তু হিসাব নেই
আমরা এআই নিয়ে বড় বড় শব্দ ব্যবহার করি—রূপান্তরমূলক, বিপ্লবী, বিশ্ব বদলে দেওয়া প্রযুক্তি। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। যেন এটি কোনো প্রাকৃতিক শক্তি, মানুষের তৈরি একটি ব্যবস্থা নয়।

কিন্তু এই সব আলোচনায় একটি শব্দ প্রায় অনুপস্থিত—স্থায়িত্ব। সহকর্মীরা ভবিষ্যতের কাজ নিয়ে তর্ক করেন, বন্ধুরা স্মার্টফোনের নতুন এআই ফিচার নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু স্থায়িত্বের কথা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

এই অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। স্থায়িত্ব ছাড়া এআই নিয়ে আলোচনা করা মানে চুলা বন্ধ করার কথা না ভেবে রান্না শেখা। প্রথমে সব ঠিকঠাক মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে খরচ বাড়ে, তাপ জমে ওঠে, আর একসময় কিছু না কিছু পুড়তে শুরু করে। এআই ক্ষেত্রেও একই বিষয়। বড় বড় সিস্টেম চালাতে বিপুল শক্তি লাগে, মানবজাতির প্রায় সব লেখা দিয়ে এগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, এবং এগুলো এমন সমাজে ব্যবহৃত হয় যেখানে বৈষম্য রয়েছে। এসব উপেক্ষা করলে সমস্যা দূর হয় না, বরং পরে তা আরও বড় হয়ে সামনে আসে।

স্থায়িত্বের কেন্দ্রেই আসল পরিবর্তন
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পডকাস্ট সিরিজে আলোচনার মাধ্যমে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে—যখন স্থায়িত্বকে কেন্দ্রে রাখা হয়, তখন এআই শুধু আকর্ষণীয় প্রযুক্তি নয়, বাস্তব উন্নয়নের একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী ডেভিড দাও বলেছেন, এআই মানেই বিশাল প্রযুক্তি নয়। ছোট বা মাঝারি আকারের এআই সিস্টেম, সাধারণ কম্পিউটার বা এমনকি অফলাইন ডিভাইস দিয়েও কাজ করা সম্ভব। এতে পরিবেশগত খরচও অনেক কম হয়। স্থানীয় তথ্য যেমন বাতাসের দিক, গাছের ধরন বা প্রাণীর শব্দ যুক্ত করলে এসব মডেল আরও কার্যকর হয়। তার মতে, এআই কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মিলেই তৈরি হলে এটি শক্তিশালী ও স্থায়ী হয়।

Sustainability in the AI World: Challenges, Opportunities & Way Forward

কমিউনিটির কণ্ঠকে বাঁচিয়ে রাখা
ফিলিপাইনের এআই উদ্যোগের সহ-প্রতিষ্ঠাতা লেই মোটিলা অন্য একটি দিক তুলে ধরেছেন। কমিউনিটি পর্যায়ে অনেক মূল্যবান ধারণা উঠে আসে, কিন্তু সেগুলো কাগজে লিখে ফাইলবন্দি হয়ে হারিয়ে যায়। তার মতে, এআইয়ের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করে কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া সম্ভব।

এই অভিজ্ঞতা আমার কাছেও পরিচিত। অসংখ্য ভালো ধারণা মিটিংয়ের নোটেই হারিয়ে যেতে দেখেছি। ধারণা হারিয়ে গেলে মানুষও হারিয়ে যায়। তাই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউকো ইতাতসু মনে করিয়ে দেন, এআই আমাদের সমাজ থেকেই শেখে—আর সেই সমাজ নিখুঁত নয়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমরা কি অসম্পূর্ণ সমাজকেই আবার তৈরি করতে চাই?” সতর্ক না হলে এআই বিদ্যমান সমস্যাগুলোই আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

নীতিমালা ও বাস্তবতার সংযোগ
এই অভিজ্ঞতাগুলো মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—স্থায়িত্ব বাদ দিলে এআই নিয়ে আলোচনা অনেকটাই ফাঁপা হয়ে যায়। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রযুক্তিকে স্থায়ী উন্নয়নের পথে রাখতে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার। এ লক্ষ্যে বৈশ্বিক ডিজিটাল চুক্তি একটি বড় পদক্ষেপ।

তবে নীতিমালা দিয়েই সব বদলানো যাবে না। অধিকাংশ মানুষ এআইকে বোঝে অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা দৈনন্দিন কথোপকথনের মাধ্যমে, কোনো রিপোর্ট পড়ে নয়।

তাই এআই নিয়ে নতুনভাবে কথা বলা জরুরি। পডকাস্ট, অনলাইন কনটেন্ট বা সামাজিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সহজ ভাষায় এই আলোচনা মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

বাস্তব প্রশ্ন, বাস্তব ভাবনা
স্থায়িত্ব ছাড়া এআই নিয়ে কথা বলা সহজ। আবার মানুষের প্রসঙ্গ বাদ দিয়েও স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা সহজ। কিন্তু এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে ভাবা কঠিন—তবু এখান থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।

প্রতিদিনের জীবনে আমরা অনেকেই এআইকে নীরবে ব্যবহার করি—ইমেইলের উত্তর দেওয়া, তথ্য খোঁজা, বিশ্লেষণ করা—সবকিছু সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে একটি প্রশ্ন জেগে ওঠে: এই সহজতার বিনিময়ে আমরা কী দিচ্ছি? আর শেষ পর্যন্ত এর মূল্য কে দেবে?

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলো শুরু হয় না গবেষণাগারে বা বড় সম্মেলনে। বরং এমন সাধারণ মুহূর্তেই শুরু হয়—এক কাপ কফির আড্ডায়, যখন একটি প্রশ্ন ভাবনার জন্ম দেয়। কারণ স্থায়িত্ব যদি আলোচনার বাইরে থাকে, তাহলে এআইয়ের প্রকৃত মূল্য একদিন সবাইকেই দিতে হবে।