হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বড় রপ্তানিকারক হিসেবে সামনে এসেছে এবং অনেক দেশের জন্য কার্যত “শেষ ভরসা” হয়ে উঠেছে। তবে টানা বিপুল রপ্তানির ফলে দেশটির নিজস্ব মজুদ দ্রুত কমে আসছে, যা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
রপ্তানিতে রেকর্ড, কিন্তু চাপ বাড়ছে
গত নয় সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে দেশটি আবারও সৌদি আরবকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক হয়েছে। জাপান, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে।
তবে এই রেকর্ড রপ্তানির পেছনে রয়েছে বড় ঝুঁকি। দেশটির অভ্যন্তরীণ তেলের মজুদ টানা চার সপ্তাহ ধরে কমছে এবং তা ঐতিহাসিক গড়ের নিচে নেমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হারে রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।
বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি
হরমুজ প্রণালীতে সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতিতে বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
এশিয়ার ঝোঁক যুক্তরাষ্ট্রের দিকে
যুদ্ধের আগে জাপান তাদের তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করত। এখন তারা দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে এবং ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিনে ফেলেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
সিঙ্গাপুরসহ আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে রিফাইনারিগুলো মার্কিন তেল কেনার দিকে ঝুঁকছে।
উৎপাদন বাড়াতে অনিশ্চয়তা
তেলের দাম বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকরা উৎপাদন বাড়াতে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে তারা বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে দায়ী করছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতি কতদিন চলবে এবং চাহিদা কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় বড় বিনিয়োগে তারা সতর্ক।

এদিকে বড় তেল কোম্পানিগুলোও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কার্যক্রমে বিঘ্নের মুখে পড়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলছে।
অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রভাব
রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামও বাড়ছে। পেট্রোলের দাম যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় প্রতি গ্যালনে এক ডলারের বেশি বেড়েছে। ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুমে চাহিদা বাড়লে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি সক্ষমতা তাত্ত্বিকভাবে প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন ব্যারেল হলেও বাস্তবে তা প্রায় ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন ব্যারেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জাহাজের স্বল্পতা এবং সমুদ্রপথে পরিবহন জটিলতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে বড় ভূমিকা রাখলেও নিজেদের মজুদ কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ ও চাহিদার এই টানাপোড়েনে আগামী কয়েক মাসই নির্ধারণ করবে বাজার কোন দিকে যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















