জাপানের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের ফুজিসাওয়া শহরে একটি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভয় তৈরির প্রচারণার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার মানুষের শহর ফুজিসাওয়ায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ী মোহাম্মদ খলিল জানান, এক দশকেরও বেশি সময় আগে থেকেই শহরে একটি মসজিদ তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। কারণ শহরের কেন্দ্রের সবচেয়ে কাছের বড় মসজিদ এবিনা মসজিদ প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এবং সেখানে ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যার চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২১ সালে একটি পরিত্যক্ত কারখানার জায়গা নির্বাচন করা হয়। পরে স্থানীয় মুসলিমরা ‘ফুজিসাওয়া মসজিদ এনপিও’ গঠন করে তহবিল সংগ্রহ, জমি ক্রয় এবং অনুমোদনের কাজ শুরু করেন। বহু বাধা পেরিয়ে গত বছর নির্মাণের অনুমতি মেলে এবং পুরোনো ভবন ভেঙে ড্রেনেজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ দিকে জাপানের নিম্নকক্ষ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি বদলে যায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইউটিউবার সুসুমু কিকুতাকে অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা শুরু করেন এবং তার নির্বাচনী বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই মসজিদ নির্মাণ ঠেকানো। তার পোস্টারে সরাসরি লেখা ছিল, “ফুজিসাওয়া মসজিদের বিরুদ্ধে” এবং “অভিবাসন বন্ধ করুন”।
মসজিদ কমিটির সদস্য আলি আল-হাকিম বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের নিয়ে নানা গুজব ছড়ানো হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচিত দাবি ছিল, মসজিদের সঙ্গে মুসলিম কবরস্থানও তৈরি হবে এবং এতে স্থানীয় পানির উৎস দূষিত হতে পারে। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে জানায়, সেখানে কোনো কবরস্থানের অনুমতি নেই এবং শহরের আইন অনুযায়ী এমন কিছু করা সম্ভবও নয়।
এ নিয়ে জাপানের রিতসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শিনজি কোজিমা বলেন, ভবিষ্যতে কী হতে পারে—এমন আশঙ্কা দেখিয়ে ভয় তৈরি করা একটি রাজনৈতিক কৌশল। তার মতে, এ ধরনের প্রচারণা বাস্তবতার চেয়ে ভীতি ও সন্দেহকে বেশি উসকে দেয়।
মসজিদ কমিটির আরেক সদস্য হামিদ রশিদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তার ভাষায়, “কেউ যদি বলে মুসলিমদের কবরের কারণে পানিদূষণ হবে, সেটি বাস্তবতার সঙ্গে না মিললেও অনেকেই সেটি বিশ্বাস করে ফেলছে।”

অন্যদিকে কিকুতাকে দাবি করেছেন, বড় মসজিদ ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বাড়াতে পারে। যদিও এবিনা এলাকার পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় মসজিদকে ঘিরে অপরাধ বৃদ্ধির কোনো তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে মুসলিম জনগোষ্ঠী এখনো মোট জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু অনলাইনে ছড়ানো বিভ্রান্তি ও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতি ছোট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অযথা আতঙ্কের প্রতীকে পরিণত করছে।
তবে স্থানীয় মুসলিমরা বলছেন, মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি সামাজিক সহায়তা ও কমিউনিটি কার্যক্রমেরও কেন্দ্র। দুর্যোগের সময় আশ্রয় দেওয়া, খাবার বিতরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ নানা জনকল্যাণমূলক কাজেও তারা যুক্ত থাকতে চান। তাদের আশা, সময়ের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ভুল ধারণা দূর হবে এবং ফুজিসাওয়া আবারও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শহর হিসেবে পরিচিত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















