পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে—এমন আশায় বুধবার আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে উত্থান হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ইঙ্গিত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য শুরু করা সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত করা হবে। তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় “বড় অগ্রগতি” হয়েছে। এরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করে।
বুধবার আরও কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ বন্ধে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেই খবরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচেও নেমে যায়। তবে পরে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক মুখপাত্র ওই প্রস্তাবকে “আমেরিকার ইচ্ছার তালিকা” বলে মন্তব্য করলে বাজারে আবার কিছুটা অনিশ্চয়তা ফিরে আসে।

তেলের দামে বড় পতন
বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৯৬ ডলারের কাছাকাছি দাঁড়ায়।
বিশ্ববাজারে এখন সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত তৈরি হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা
তবে বাজারে স্বস্তির এই ধারা স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সতর্ক করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকেরা। ন্যাশনাল সেন্টার ফর এনার্জি অ্যানালিটিকসের জ্যেষ্ঠ ফেলো নিল অ্যাটকিনসন বলেন, পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।
তার ভাষায়, “সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় তেলের বাজার এখনও অস্থিতিশীল। বাজার কার্যত চাপের মধ্যে রয়েছে এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়েছে।”

চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা
এদিকে বুধবার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া। চীন ইরানি তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বেইজিং প্রভাব খাটাতে পারে।
শেয়ারবাজারে উত্থান
তেলের দাম কমার খবরে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বুধবার ০.৬ শতাংশ বেড়ে নতুন উচ্চতার দিকে এগিয়েছে।
ইউরোপে স্টক্স ৬০০ সূচক ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। জার্মানি ও ব্রিটেনের বাজারেও উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। এশিয়ার বাজারেও একই চিত্র দেখা গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে, আর চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারে ১ শতাংশের বেশি উত্থান হয়েছে।

জ্বালানির খুচরা দামে চাপ
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা মূল্য এখনও বাড়ছে। এএএ মোটর ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দেশটিতে গ্যাসোলিনের গড় মূল্য গ্যালনপ্রতি ৪.৫৪ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫৩ শতাংশ বেশি।
একইভাবে ডিজেলের গড় দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে গ্যালনপ্রতি ৫.৬৭ ডলার, যা সংঘাত শুরুর পর থেকে ৫১ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপরিশোধিত তেলের দামের পরিবর্তনের প্রভাব খুচরা বাজারে পৌঁছাতে সাধারণত কয়েকদিন সময় লাগে।
ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি এখনও কার্যকর আছে—এমন সংকেতই মূলত বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্যও বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তেলের দাম কমলেও হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















