ভারতের কেরালা রাজ্যের মালাপ্পুরম জেলার ছোট্ট গ্রাম কোডিনহি আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। বহু বছর ধরেই “টুইন টাউন” বা যমজের গ্রাম হিসেবে পরিচিত এই গ্রাম সম্প্রতি নতুন করে ভাইরাল হয়েছে একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারণাকে ঘিরে। তবে শুধু প্রচারণাই নয়, কোডিনহির আসল আকর্ষণ তার বিস্ময়কর বাস্তবতা—এখানে অস্বাভাবিক সংখ্যক যমজ শিশুর জন্ম হয়।
প্রথম দেখায় কোডিনহিকে সাধারণ একটি গ্রাম মনে হলেও, একটু গভীরে গেলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক চিত্র। গ্রামের বিভিন্ন পরিবারে একসঙ্গে জন্ম নেওয়া যমজ শিশুদের উপস্থিতি এতটাই বেশি যে এটি বহু বছর ধরে গবেষক, পর্যটক ও সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্র হয়ে আছে।
যমজের গ্রাম হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি
প্রায় দুই হাজার পরিবারের এই গ্রামে আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫৫০ জোড়া যমজ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতি এক হাজার জন্মে এখানে ৪২ থেকে ৪৫টি যমজ জন্মের ঘটনা ঘটে, যা ভারতের জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণত ভারতে প্রতি এক হাজার জন্মে মাত্র ৪ থেকে ৯টি যমজ জন্মের তথ্য পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই প্রবণতা কয়েক বছর নয়, অন্তত ছয় থেকে সাত দশক ধরে অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছরই নতুন নতুন যমজ শিশুর জন্ম হচ্ছে গ্রামটিতে। স্থানীয়দের দাবি, কোডিনহিতে জন্ম নেওয়া নারীরা বিয়ের পর অন্য এলাকায় চলে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের মধ্যেও যমজ জন্মের ঘটনা দেখা যায়।
ভাইরাল প্রচারণায় নতুন আলোচনায়
সম্প্রতি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্ট কোডিনহিকে কেন্দ্র করে একটি সৃজনশীল বিজ্ঞাপন প্রচারণা চালায়। সেখানে গ্রামের যমজ পরিচিতিকে ব্যবহার করে “সবকিছু জোড়ায় জোড়ায়” পাওয়া যায়—এমন একটি ধারণা তুলে ধরা হয়। “ডাবল অফার” ও “ডাবল ভ্যালু” ধারণার সঙ্গে বাস্তব জীবনের যমজ রহস্যকে মিলিয়ে তৈরি করা এই প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
অনেক ব্যবহারকারী বিজ্ঞাপনটির অভিনবত্ব ও হাস্যরসের প্রশংসা করেছেন। একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, এটি অত্যন্ত সৃজনশীল এবং ধারণাটি দারুণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রহস্যের সমাধান এখনো মেলেনি
কোডিনহির এই অস্বাভাবিক যমজ জন্মহার নিয়ে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষকেরা বহুবার গবেষণা চালিয়েছেন। পরিবেশগত কারণ, পানির উপাদান, খাদ্যাভ্যাস কিংবা বংশগত বৈশিষ্ট্য—সবকিছু নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্বের কিছু অঞ্চলে, যেমন নাইজেরিয়ার ইগবো-ওরা এলাকায় বিশেষ খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যমজ জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোডিনহিতে তেমন কোনো স্পষ্ট যোগসূত্র দেখা যায়নি। জিনগত কারণও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনায় এসেছে, কিন্তু গবেষকেরা এখনো এমন কোনো নির্দিষ্ট জিন শনাক্ত করতে পারেননি যা এই উচ্চ যমজ জন্মহারের জন্য দায়ী।
একই সঙ্গে দূষণ, রাসায়নিক প্রভাব, জীবনযাপন পদ্ধতি কিংবা স্থানীয় লোককাহিনিতে প্রচলিত অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যাগুলোকেও গবেষণায় গুরুত্বহীন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
নিজস্ব পরিচয়ে গর্বিত এক গ্রাম
কোডিনহির অনেক বাসিন্দাই যমজ জন্মকে ঈশ্বরের আশীর্বাদ হিসেবে দেখেন। বৈজ্ঞানিক রহস্যের পাশাপাশি এই বিশ্বাসও গ্রামটির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই বিশেষ পরিচয়কে সংরক্ষণ ও নথিভুক্ত করতে স্থানীয়রা ২০০৮ সালে “টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন” বা টিএকে নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনটি যমজ শিশুদের তথ্য সংরক্ষণ, পরিবারগুলোর সহায়তা এবং গবেষকদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করে যাচ্ছে।
কোডিনহির এই রহস্য এখনো অমীমাংসিত। তবে অজানা এই বৈশিষ্ট্যই গ্রামটিকে বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছে।
![]()
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















