মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৪৭.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রতি দেশের নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)-এর নতুন এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
‘ফস্টারিং বাংলাদেশ’স এনার্জি ট্রানজিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে বড় অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
কয়লার দামে বড় উল্লম্ফন
২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যে গড় কয়লার দাম ২৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। একই সময় তেলের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকে।
তবে পরবর্তীতে কয়লার দাম প্রায় ৫৯.৭ শতাংশ কমে গেলেও এবং তেলের দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন খরচ কমেনি। প্রতিবেদনের লেখক ও আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বেসরকারি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেওয়া উচ্চ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে রেখেছে।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রতি ইউনিটে গড়ে ৯.৫ টাকা এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে ৫.৯ টাকা করে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়েছে। এছাড়া গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণে কম সক্ষমতায় পরিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে এখন ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়কালে শুধু এলএনজি আমদানিতেই বাংলাদেশকে প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন ডলার বা ১৩১.৩৪ বিলিয়ন টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
এই হিসাব করা হয়েছে ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ের আমদানি প্রবণতা এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে প্রায় ২০ ডলার দামের ভিত্তিতে। এতে পুনরায় গ্যাসীকরণ ও টার্মিনাল খরচ ধরা হয়নি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে জাতীয় গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২.৩ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৩.৮ শতাংশ। ফলে আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের মূল্য অস্থিরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কার্যকর সুরক্ষা তৈরি করতে পারছে না।
এছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। আইইইএফএর বিশ্লেষণে বলা হয়, ১০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলে জ্বালানি তেল আমদানি কমে দীর্ঘমেয়াদে আমদানি শুল্কের তুলনায় ৩০ গুণের বেশি সাশ্রয় সম্ভব।
বিবিআইএন জলবিদ্যুৎ হতে পারে বিকল্প
গ্যাসের চাহিদা কমাতে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) কাঠামোর আওতায় জলবিদ্যুৎ আমদানির সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ২০৩০ সালের পর নেপাল ও ভুটান থেকে মার্চ-সেপ্টেম্বর উচ্চ চাহিদার সময়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ পাওয়া গেলে বছরে প্রায় ২৫৭ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয় হতে পারে।
একই সঙ্গে করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে উন্মুক্ত প্রবেশ ব্যয় কমিয়ে আনারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে তৈরি পোশাক খাতসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব উৎপাদন লক্ষ্যে এগোতে পারবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫৬.৬ বিলিয়ন টাকা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও জ্বালানি খাতের আর্থিক চাপে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৬২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, আইইইএফএ বলছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ও এলএনজি ভর্তুকির চাপ আরও বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















