শান্তিনিকেতনের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো কেবল ঘটনামাত্র নয়, বরং এক গভীর মানসিক টানাপোড়েনের দলিল। নন্দলাল বসুর শান্তিনিকেতন ত্যাগের ঘটনাটি তেমনই এক অধ্যায়। এটি শুধু একজন শিল্পীর স্থানবদলের ইতিহাস নয়; বরং আধুনিক ভারতীয় শিল্পচর্চার ভিত গড়ে ওঠার সময়কার সম্পর্ক, আনুগত্য, দ্বিধা এবং সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার এক জটিল কাহিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন শান্তিনিকেতনে একটি স্বতন্ত্র শিল্পশিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছিলেন, তখন তাঁর চোখ ছিল নন্দলাল বসুর দিকে। অবনীন্দ্রনাথের শিষ্য হিসেবে তখন নন্দলাল কলকাতার শিল্পজগতে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শুধু দক্ষ শিল্পী হিসেবে দেখেননি; তিনি মনে করেছিলেন, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখে ভারতীয় শিল্পের যে নতুন ভাষা তৈরি হতে পারে, তার অন্যতম নির্মাতা হতে পারবেন নন্দলাল।

এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই শান্তিনিকেতনে চিত্রকলার একটি বিভাগ গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে কলাভবন নামে পরিচিত হয়। কিন্তু শুরুটা মোটেই সুসংগঠিত ছিল না। সেই সময়ের স্মৃতিকথা থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানের কাঠামো তখনও অসম্পূর্ণ, ছাত্রাবাস নির্মাণাধীন, প্রশাসনিক দায়িত্ব ছড়িয়ে আছে নানা ব্যক্তির হাতে। তবু এক ধরনের সৃষ্টিশীল উত্তেজনা ছিল চারপাশে। ছাত্ররা নতুন কিছু শুরু হওয়ার অনুভূতি পাচ্ছিলেন।
এই প্রাথমিক পর্যায়ে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিবরণে উঠে আসে, কীভাবে ছাত্ররা হঠাৎ শুনলেন “গুরুদেব কলাভবন খুলেছেন”, এবং কীভাবে তারা প্রায় অভিযাত্রীর মতো নতুন বিভাগে যোগ দিতে চলে গেলেন। এই চিত্রটি প্রমাণ করে, কলাভবন কোনও পরিকল্পিত প্রশাসনিক প্রকল্প হিসেবে জন্ম নেয়নি; বরং তা ছিল এক সাংস্কৃতিক স্বপ্নের পরীক্ষাগার।

তবে এই স্বপ্নের কেন্দ্রে থেকেও নন্দলাল যেন পুরোপুরি স্বাধীন ছিলেন না। তাঁর শিল্পীসত্তার পেছনে অবনীন্দ্রনাথের প্রভাব এত গভীর ছিল যে, শান্তিনিকেতনে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর পক্ষে সহজ হয়নি। অবনীন্দ্রনাথও প্রিয় শিষ্যকে কলকাতার শিল্পপরিসর থেকে হারাতে প্রস্তুত ছিলেন না। ফলে নন্দলাল দুই জগতের টানাপোড়েনে আটকে পড়েন— একদিকে রবীন্দ্রনাথের মুক্ত প্রকৃতিনির্ভর শিল্পচিন্তা, অন্যদিকে অবনীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ শিক্ষাপদ্ধতি ও কলকাতাকেন্দ্রিক শিল্পবৃত্ত।

এই দ্বন্দ্বের পরিণতিই সম্ভবত তাঁর আকস্মিক প্রস্থান। পুজোর ছুটিতে কলকাতায় গিয়ে আর ফিরে এলেন না তিনি। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ঘটনাটি ঘটেছিল প্রায় কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই। রবীন্দ্রনাথ পরে সি এফ অ্যান্ড্রুজকে চিঠিতে যে হতাশার কথা লিখেছিলেন, তা কেবল প্রশাসনিক ক্ষোভ নয়; সেখানে ব্যক্তিগত আঘাতও স্পষ্ট। তিনি মনে করেছিলেন, যে স্বপ্ন তিনি গড়ে তুলছিলেন, তার ভিত হঠাৎ নড়ে গেছে।

কিন্তু নন্দলালের এই চলে যাওয়া কি নিছক অবহেলা ছিল? নানা সূত্র বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। তিনি নিজেই বহুবার লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য এবং শিলাইদহের প্রকৃতি তাঁর শিল্পবোধকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিল। পদ্মার চর, পাখির চলন, আলো-ছায়ার পরিবর্তন— এগুলো তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল শিল্পশিক্ষার নতুন অভিধান। আগে যেখানে পুরাণ ও শাস্ত্র থেকে ভাবনা আসত, সেখানে প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল জীবন্ত শিক্ষক।
অতএব, যে মানুষ শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মধ্যে শিল্পের মুক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন, তিনি কেন হঠাৎ সরে গেলেন— এই প্রশ্নের উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি। হয়তো ব্যক্তিগত আনুগত্য, হয়তো শিল্পরাজনীতির চাপ, অথবা হয়তো আত্মপরিচয়ের সংকট— সবকিছু মিলে এই সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছিল।

তবে ইতিহাসের বিদ্রূপ হলো, সাময়িক বিচ্ছেদ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত নন্দলালই কলাভবনের আত্মা হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর হাত ধরেই শান্তিনিকেতন ভারতীয় শিল্পচর্চার এক স্বতন্ত্র কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। অর্থাৎ যে সম্পর্ক একসময় ভেঙে যেতে বসেছিল, শেষ পর্যন্ত সেটিই ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী সেতুগুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায়।
মূল সূত্রভিত্তিক উপাদান:
সারাক্ষণ প্রতিবেদক 


















