২০১৩ সালের শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে আগামী ১৪ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. গোলাম মোর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন। প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশ জারি করে। একই আবেদনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধেও প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চাওয়া হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি গাজী এমএইচ তামিম ট্রাইব্যুনালে বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান চালানোর সময় দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের বিষয়ে এমন বক্তব্য দেন, যাতে ঘটনাটিকে “উচ্ছৃঙ্খল লোকজন দমন” হিসেবে তুলে ধরা হয়।
একইসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, শুরু থেকেই মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা সম্প্রচারমাধ্যমে হেফাজতের সমাবেশকে উসকানিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করেন। পরে তারা শাপলা চত্বরে নিহতদের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা এবং মৃত্যুর তথ্য গোপনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আগামী ১৪ মে অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করতে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৭ জুন দিন নির্ধারণ করা হয়।
তদন্তে অগ্রগতি
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক শহীদুল হক, জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক মহাপরিচালক বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং শাহরিয়ার কবিরসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম বলেন, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা ইচ্ছাকৃতভাবে শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন এবং নিহতদের তথ্য গোপনে ভূমিকা রেখেছেন।
গত মঙ্গলবার তিনি জানান, হেফাজতের সমাবেশে নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
শাপলা চত্বরের সেই রাত
২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম “ঢাকা অবরোধ” কর্মসূচি পালন করে। সংগঠনটি কোরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগের প্রতিবাদ এবং ১৩ দফা দাবিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল।
সেদিন হাজার হাজার আলেম, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও সমর্থক রাজধানীতে জড়ো হয়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় অবস্থান নেন। পরে গভীর রাতে যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে সমাবেশটি ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় গুলিবর্ষণ, টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালে হেফাজতে ইসলাম ৯৩ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে ৬১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ২০১৪ সালে প্রকাশিত “শহীদনামা” গ্রন্থে ৪১ জন নিহতের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন গতি
ঘটনার ১৩ বছর পার হলেও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর হেফাজত নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ দায়ের করেন। সেখানে শেখ হাসিনাসহ সাবেক মন্ত্রী, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কয়েকজন এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















