যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবরোধে ইরানের অর্থনীতি এখন ভয়াবহ চাপে পড়েছে। দেশটির প্রধান আয়ের উৎস তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেহরানে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের আগেই মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও মুদ্রার দরপতনে দুর্বল হয়ে পড়া অর্থনীতি এখন আরও বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান উত্তেজনা ইরানের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত হয়ে এসেছে। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলো প্রণালী অতিক্রম করতে পারছে না। ফলে প্রতিদিন উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি না হয়ে জমে থাকছে সংরক্ষণাগারে।
তেল রপ্তানি বন্ধে বাড়ছে চাপ
ইরান প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। এর অর্ধেক দেশের ভেতরে ব্যবহৃত হলেও বাকি অংশ রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অবরোধ শুরুর পর থেকে রপ্তানির পথ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত সমাধান না এলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা শেষ হয়ে যেতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ইরান কিছু তেলক্ষেত্রে উৎপাদন কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ সংরক্ষণের জায়গা শেষ হয়ে গেলে অনেক পুরোনো তেলকূপ বন্ধ করে দিতে হতে পারে, যেগুলো পরে পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
বিকল্প পথে বাণিজ্যের চেষ্টা
দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রবন্দরগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আমদানি-রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বর্তমান অবরোধে দেশটি এখন স্থলপথ ও বিকল্প সমুদ্রপথ ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তান, তুরস্ক ও রাশিয়ার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া মধ্য এশিয়ার রেলপথ ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিকল্প ব্যবস্থা সাময়িক স্বস্তি দিলেও পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোর বিকল্প হতে পারবে না। বিশেষ করে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে এই পথগুলো কার্যকর নয়।

মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বে জনজীবন বিপর্যস্ত
যুদ্ধ ও অবরোধের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনও কঠিন হয়ে উঠেছে। ইরানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান দ্রুত কমছে। বিভিন্ন খাতে ছাঁটাই বাড়ছে এবং অন্তত ১০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের অনেকেই কয়েক মাস ধরে পুরো বেতন পাচ্ছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ নিজেদের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ার গল্প শেয়ার করছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম মুখ মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, সামুদ্রিক অবরোধের মাধ্যমে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির জাতীয় ঐক্য দুর্বল করারও চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে চীন ও হংকংভিত্তিক কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
যুদ্ধ, অবরোধ ও দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানের অর্থনীতি এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। তেহরানের জন্য সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই চাপ মোকাবিলা করে তারা কতদিন টিকে থাকতে পারবে।
ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধে অর্থনীতি গভীর সংকটে, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















