সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হঠাৎ করেই বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি শ্রমিককে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স ও প্রবাসী কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল লাখো পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
সম্প্রতি কয়েকজন পাকিস্তানি শ্রমিক অভিযোগ করেছেন, কোনও পূর্বঘোষণা ছাড়াই তাদের আটক করা হচ্ছে এবং পরে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অনেকের দাবি, নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায়ের পাকিস্তানিরাই বেশি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও আমিরাতের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ইরানকে ঘিরে পাকিস্তানের অবস্থান নিয়ে আবুধাবি অসন্তুষ্ট বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আমিরাতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় পাকিস্তান প্রত্যাশিত সমর্থন দেয়নি বলে মনে করছে দেশটি। এর জের ধরেই পাকিস্তানি শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়ানো হয়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
শিয়া শ্রমিকদের অভিযোগ
আমিরাতে কর্মরত বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি শিয়া শ্রমিক জানিয়েছেন, গত এক মাসে তাদের হঠাৎ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে আটক কেন্দ্রে রেখে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পাকিস্তানের শিয়া নেতাদের দাবি, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে কয়েক হাজার শিয়া পাকিস্তানিকে আমিরাত ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
তবে পাকিস্তান সরকার গণবিতাড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, শুধুমাত্র অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যদিও শিয়াদের আলাদাভাবে টার্গেট করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সরকার স্পষ্ট কিছু বলেনি।
ভিসা নবায়নেও জটিলতা
আমিরাতভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাকিস্তানি কর্মীদের ভিসা নবায়ন অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন ভিসা অনুমোদনেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি চাকরি বাতিল বা দেশ ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে।
আবুধাবির একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিক জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক পাকিস্তানি টেকনিশিয়ানকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ লাখের বেশি পাকিস্তানি বসবাস করেন। তারা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। গত বছর শুধু আমিরাত থেকেই পাকিস্তানে এসেছে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ।
এ অবস্থায় শ্রমিক ফেরত পাঠানো অব্যাহত থাকলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আমিরাত পাকিস্তানের কাছে কয়েকশ কোটি ডলারের ঋণ ফেরত চাওয়ায় ইসলামাবাদের অর্থনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে পাকিস্তান
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পাকিস্তান এক জটিল কূটনৈতিক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা— দুই দিক সামলাতে গিয়ে আমিরাতের অসন্তোষের মুখে পড়েছে ইসলামাবাদ।
এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শুধু প্রবাসী শ্রমিক নয়, পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















