বিশ্ব রাজনীতিতে এখন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য এবং শক্তিশালী নেতাকেন্দ্রিক রাজনীতির উত্থান যেন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা। ইউরোপ থেকে আমেরিকা—বহু দেশেই মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনীতি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। কারণ তিনি শুধু ক্ষমতায় টিকে আছেন তা নয়, বরং এমন এক রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছেন যা ডানপন্থার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে দ্বিধা করে না।
অনেক পশ্চিমা নেতা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মোকাবিলায় সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, সেখানে সানচেজ প্রকাশ্যে বিরোধিতার পথ বেছে নিয়েছেন। সামরিক ব্যয় বাড়ানোর চাপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে অবস্থান—বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। এই অবস্থান কেবল কূটনৈতিক সাহসের পরিচয় নয়; এটি তার বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শনের অংশ, যেখানে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিকে আপসের ভাষা নয়, বিকল্প ক্ষমতার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।

সানচেজের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু থেকেই ছিল প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধে। নিজ দলের ভেতর থেকেই তিনি নেতৃত্ব পুনর্দখল করেছিলেন তৃণমূলের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে। পরে দুর্নীতিতে জর্জরিত রক্ষণশীল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট এনে ক্ষমতায় আসেন। স্পেনের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সেটি ছিল একটি বড় মোড়। কিন্তু তার আসল রাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু হয় ক্ষমতায় বসার পর।
বিশেষ করে কাতালোনিয়া প্রশ্নে তার সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের জন্য সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্ত স্পেনজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছিল। বিচারব্যবস্থার একাংশ, রক্ষণশীল দল এবং জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো এটিকে রাষ্ট্রের দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু সানচেজ ভিন্ন হিসাব করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা কখনও কখনও কঠোর অবস্থানের চেয়ে কার্যকর হতে পারে। পরবর্তী সময়ে কাতালান সংকটের উত্তেজনা কমে আসা তার সেই রাজনৈতিক ঝুঁকিকে আংশিক বৈধতা দেয়।
তবে সানচেজের শক্তি শুধু রাজনৈতিক কৌশলে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিকেও নিজের রাজনীতির কেন্দ্রে রেখেছেন। ন্যূনতম মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো, শ্রমিক সুরক্ষা জোরদার করা, অস্থায়ী চাকরির প্রবণতা কমানো এবং নারী ও এলজিবিটিকিউ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় আইনগত পরিবর্তন—এসব পদক্ষেপ তার সরকারের পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই সংস্কারগুলোকে অনেক সমালোচক অতিরিক্ত উদারনৈতিক বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্পেনের অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন ও সেবাখাত—সব মিলিয়ে দেশটি প্রবৃদ্ধির নতুন গতি পেয়েছে। অর্থাৎ সানচেজ এমন একটি বার্তা দিতে পেরেছেন যে সামাজিক কল্যাণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের বিপরীত নয়।

স্পেনের অতীত নিয়ে তার অবস্থানও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির স্বৈরশাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর উত্তরাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙতে তিনি উদ্যোগ নেন। গণকবর অনুসন্ধান, গৃহযুদ্ধের নিহতদের মরদেহ পুনঃসমাহিত করা এবং রাষ্ট্রের স্মৃতিনীতিকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ ছিল কেবল ইতিহাসচর্চা নয়; বরং গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা।
অবশ্য সানচেজকে নিখাদ আদর্শবাদী ভাবলে ভুল হবে। তার রাজনীতিতে বাস্তববাদও সমানভাবে উপস্থিত। চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী অভিবাসন নীতি সাজানো কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে তিনি আদর্শের চেয়ে কার্যকারিতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সম্ভবত এ কারণেই তার সরকার একই সঙ্গে প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—স্পেনের এই মডেল কি অন্য কোথাও কার্যকর হতে পারে? এর সহজ উত্তর নেই। স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে স্বৈরশাসনের অভিজ্ঞতা, দেশটির জনগণের মধ্যে উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে একটি বিশেষ সতর্কতা তৈরি করেছে। এছাড়া বামঘরানার বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি সানচেজকে আরও নমনীয় অবস্থান নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। সব দেশে সেই বাস্তবতা নেই।
তারপরও সানচেজের রাজনৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। এমন এক সময়ে যখন বহু মধ্যপন্থী নেতা ডানপন্থার ভাষা ধার করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, তখন তিনি ভিন্ন পথ দেখিয়েছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে প্রগতিশীল রাজনীতি কেবল প্রতিরোধের ভাষা নয়, বরং কার্যকর শাসনেরও ভাষা হতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এটাই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় বার্তা।

ওমর জি. এনকারনাসিওন 


















