নেপালের বহু পরিবারে বিদেশে যাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং প্রায় একটি প্রজন্মগত বাস্তবতা। কাঠমান্ডুর অলিগলি থেকে শুরু করে পাহাড়ি গ্রামের উঠোন—সব জায়গাতেই এমন অসংখ্য তরুণের গল্প আছে, যারা জীবিকার নিশ্চয়তার খোঁজে উপসাগরীয় দেশগুলোর পথে পাড়ি জমিয়েছে। তাদের পাঠানো অর্থই বছরের পর বছর ধরে নেপালের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সেই ভরসার ভিত্তিকেই এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
নেপালের অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক রেমিট্যান্সনির্ভর। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ থেকে। এই আয় বহু পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার তৈরি করেছে এবং গ্রামীণ জীবনের মান উন্নত করেছে। কিন্তু অর্থনীতির এই সাফল্যের আড়ালে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা, যার ভয়াবহতা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সমস্যাটি কেবল সাময়িক অর্থনৈতিক ধাক্কার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি রাষ্ট্র কতদিন এমন একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে, যার নিয়ন্ত্রণ মূলত অন্য দেশের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার হাতে। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে নেপালের শ্রমবাজার, বৈদেশিক আয়, এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের আয় কমে গেলে বা চাকরি ঝুঁকিতে পড়লে সেই চাপ প্রথমে গিয়ে পড়ে তাদের পরিবারের ওপর, পরে পুরো জাতীয় অর্থনীতিতে।

নেপালের জন্য এই পরিস্থিতি আরও জটিল কারণ দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। তরুণদের একটি বড় অংশ এখনও কাজের খোঁজে বিদেশমুখী। ফলে সরকার এক ধরনের দ্বৈত সংকটে আটকে আছে—একদিকে বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখা, অন্যদিকে দেশের ভেতরে কর্মসংস্থানের ব্যর্থতা সামাল দেওয়া।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু রেমিট্যান্সে আঘাত করেনি, নেপালের পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধি, ফ্লাইট বাতিল এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াতে অনিশ্চয়তা পর্যটকদের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আগত পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত চাপে পড়েছে। এমন এক সময়ে এই সংকট এসেছে, যখন নেপাল পর্যটন পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার আশা করছিল।
এই বাস্তবতা নেপালকে একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: বিদেশে শ্রম রপ্তানি কি উন্নয়নের স্থায়ী কৌশল হতে পারে? যদি একটি দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী নিয়মিতভাবে বিদেশে চলে যায়, তবে সেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শক্তি কীভাবে গড়ে উঠবে?

সম্ভবত এখন সময় এসেছে উন্নয়নের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার। নেপালের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দেশীয় কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করা। জলবিদ্যুৎ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং হালকা উৎপাদনশিল্প—এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের জন্যও আরও সুরক্ষিত ও বৈচিত্র্যময় কর্মবাজার খুঁজে বের করা জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে নতুন শ্রমবাজার তৈরি, শ্রমিক অধিকার নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন—এসব এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ।
রেমিট্যান্স যে নেপালের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। লাখো পরিবার এই অর্থের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের জীবন বদলেছে। কিন্তু বর্তমান সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, বাইরের আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তোলে। কারণ বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানি সংকট বা রাজনৈতিক অস্থিরতা—এসবের ওপর কোনো দেশেরই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
নেপাল হয়তো এই ধাক্কাও সামলে উঠবে। কিন্তু আসল পরীক্ষা অন্য জায়গায়। এই সংকটকে কি দেশটি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নেবে, নাকি আগের মতোই অস্থায়ী স্বস্তির ওপর নির্ভর করে যাবে? যদি বর্তমান বাস্তবতা থেকেও শিক্ষা না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্যও বিদেশে পাড়ি জমানো ছাড়া আর কোনো বাস্তব পথ খোলা থাকবে না।
নির্ভরতার এই ফাঁদ এখন স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় ভুল হবে সেটিকে অস্বীকার করা।

ব্রাবিম কার্কি 


















