ভারতের প্রভাবশালী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস এবার বিদেশে নিজেদের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করতে সক্রিয় প্রচার শুরু করেছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে সফর করছেন। তাদের দাবি, আরএসএসকে ঘিরে যে “ভুল ধারণা” আন্তর্জাতিকভাবে ছড়ানো হয়েছে, তা দূর করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা বাড়ার পরই এই কূটনৈতিক ও জনসংযোগ তৎপরতা সামনে এসেছে। আরএসএস নেতাদের মতে, সংগঠনটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উগ্রপন্থী ও সংখ্যালঘুবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বিদেশে আরএসএসের প্রচার কার্যক্রম

আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও জার্মানিতে বিভিন্ন সভা ও বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। সেখানে শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তার ভাষ্য, আরএসএসকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কয়েকটি নির্দিষ্ট অভিযোগ বারবার সামনে আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংগঠনটিকে আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে চিত্রিত করা, সমাজকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ এবং হিন্দু আধিপত্যবাদ ছড়ানোর দাবি।
হোসাবালে বলেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দাবি, আরএসএস একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন, যার লক্ষ্য দেশের ঐতিহ্য ও সমাজকে শক্তিশালী করা।
সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে বিতর্ক
ভারতের রাজনীতিতে আরএসএস দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বহুবার অভিযোগ করেছে, সংগঠনটির আদর্শ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে দুর্বল করছে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে অনিরাপত্তা বাড়াচ্ছে।

বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায় নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনের প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে। সমালোচকদের মতে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিস্তার ভারতের সামাজিক ভারসাম্যে চাপ তৈরি করছে।
তবে আরএসএস এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, তারা সব সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও সামাজিক ঐক্যের পক্ষে কাজ করছে।
মোদির রাজনীতিতে আরএসএসের প্রভাব
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে আরএসএসের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। তরুণ বয়সেই মোদি সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ভারতীয় জনতা পার্টির বিস্তৃত সাংগঠনিক শক্তির পেছনেও আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক দশকে ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে আরএসএসের প্রভাব আরও বেড়েছে।

পুরনো বিতর্ক ও নিষেধাজ্ঞা
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আরএসএস একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর সংগঠনটির ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। যদিও পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
বর্তমানে সংগঠনটি নিজেদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এখনও তীব্র।
নতুন আন্তর্জাতিক কৌশল
আরএসএস এখন ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আরও কয়েকটি অঞ্চলে সফরের পরিকল্পনা করছে। সংগঠনটির দাবি, তারা বিশ্বজুড়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে এবং “ভুল ব্যাখ্যা” দূর করতে এই উদ্যোগ চালিয়ে যাবে।
একই সঙ্গে সংগঠনটি ভারতে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য কমানোর বিষয়টিকেও নিজেদের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে সামনে আনছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে নিম্নবর্গ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভোটের প্রশ্নে চাপের মুখে পড়ার পর এই ইস্যুকে নতুনভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















