যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সংযমের একগুচ্ছ দাওয়াই দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ এতে কি সমস্যার মোকাবিলা করা যাবে?
পশ্চিম এশিয়ায় পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তার নিশ্চয়তা নেই৷ এরই মধ্যে গত চার দিনে দুবার প্রধানমন্ত্রী আসন্ন কঠিন সময়ের কথা ভেবে সতর্কবার্তা দিয়েছেন৷
মোদীর দাওয়াই
গত রবিবার হায়দরাবাদের সভা থেকে একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, যাতে আগামী দিনের অনিবার্য পরিস্থিতির জন্য ভারত তৈরি থাকতে পারে৷
ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে গণপরিবহণের উপরে গুরুত্ব আরোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী৷ তিনি সাধারণ মানুষকে মেট্রো, বাস বা লোকাল ট্রেন ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছেন৷ এর ফলে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি কমবে৷ বড় ব্যবসায়ীদের প্রতি তার বার্তা, তারা যেন ট্রাক বা সড়কপথের উপরে নির্ভরতা কমিয়ে পণ্য পরিবহণের জন্য রেলপথ বেশি ব্যবহার করেন৷
ভারতের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৫৯ শতাংশই খরচ হয় পরিবহণ ক্ষেত্রে৷ প্রধানমন্ত্রী কর্মস্থলে যাওয়ার ব্যাপারে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন৷ পেট্রল-ডিজেলের ব্যবহার কমাতে তিনি ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার কথা বলেছেন৷
প্রতি বছর ভোজ্য তেল আমদানির জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ভারতকে খরচ করতে হয়৷ তাই ভোজ্য তেলের ব্যবহার কমাতে বলেছেন মোদী৷
বিলাসদ্রব্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি বলে মত তার৷ দামি স্মার্টফোন, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বা অতিরিক্ত সোনা কেনা থেকে সাধারণ মানুষ বিরত থাকার আবেদন জানিয়েছেন৷ বিদেশ ভ্রমণের উপরেও রাশ টানতে বলেছেন তিনি৷
কেন আহ্বান মোদীর
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি৷ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে৷ তেলের দাম আরো বাড়লে দেশে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছতে পারে৷ সেই বিপর্যয় এড়াতেই দেশবাসীকে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানিয়েছেন মোদী৷
রবিবার এই পরামর্শ দেয়ার পরে ফের মঙ্গলবার এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী৷ তিনি বর্তমান অবস্থাকে কোভিড পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন৷ জ্বালানি তেলের সংকটের গভীরতা বোঝাতে কেন্দ্র জানিয়েছে, বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম বাড়া সত্ত্বেও ভারতে মূল্যবৃদ্ধি হয়নি৷ এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির আয় দৈনিক এক হাজার কোটি টাকা কমে গিয়েছে৷ বাড়ছে লোকসানের বোঝা৷
পশ্চিমবঙ্গ-সহ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন থাকায় নয়াদিল্লি দাম বাড়ায়নি, এমন যুক্তি সামনে আসছে৷ যদিও এই যুক্তি খারিজ করেছে কেন্দ্র৷ পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী মঙ্গলবার বণিকসভার অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘‘গত চার বছরে অর্থাৎ ২০২২ থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়েনি৷ এই সময়ে কতগুলো নির্বাচন হয়েছে? তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে ভোটের সম্পর্ক নেই৷”
সময় নিয়ে প্রশ্ন
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে অপরিশোধিত তেলের দাম অনেকটা বেড়েছে৷ গত বছর ব্যারেল প্রতি দাম ছিল গড়ে ৭০ ডলার৷ এপ্রিলে সেটা পৌঁছেছে ১১৩ ডলারে৷ এই পরিস্থিতিতে দাম না বাড়ালে তেল সংস্থাগুলির লোকসানের অঙ্ক ১ লক্ষ কোটি টাকা স্পর্শ করতে পারে বলে আশঙ্কা৷
অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘শুধু ভারত নয়, সারা পৃথিবী এখন একটা সংকটের মধ্যে রয়েছে৷ এই ধরনের সাবধানতা এশিয়ার কয়েকটি দেশে অবলম্বন করা হয়েছে৷ কম তেলের ব্যবহার, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের উপরে জোর দেয়া হচ্ছে৷ প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে সাবধান হতে বলেন, সেটার মধ্যে অযৌক্তিক কিছু আমি দেখি না৷”
তবে সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিরূপ৷ বলেন, ‘‘যেটা একটু চোখে লাগে, সেটা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানের সময়টা৷ এই সংকট তো বেশ কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছিল, তখন যেহেতু ভোট চলছিল চার-পাঁচটা রাজ্যে, তখন এ সব কথা শোনা যায়নি৷ যেই ভোট শেষ হল, অমনি সংযমের বার্তা দেয়া হল৷ অর্থনৈতিক ভাবে যেটা বাধ্যবাধকতা, তার সঙ্গে রাজনীতিকে জড়িয়ে ফেলা উচিত নয়৷ কথাগুলো বলা উচিত ছিল, আগেই বলতে পারতেন৷”
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে ইতিমধ্যে৷ প্রধানমন্ত্রীর কনভয়ে গাড়ির সংখ্যা অর্ধেক কমানো হয়েছে৷ তার কনভয়ে ক্রমশ বাড়ানো হবে বৈদ্যুতিন গাড়ির সংখ্যা৷
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তার সচিবালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন যথাসম্ভব গাড়ি কম ব্যবহার করার জন্য৷ নিজের কনভয়ে গাড়ি কমানোর কথা বলেছেন তিনি৷ একইভাবে নবনির্বাচিত বিধায়কদের বলা হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে বাস, ট্রেনে সফর করতে৷
এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে অভিরূপ বলেন, ‘‘করোনার সময়ে আমরা নতুন নতুন কিছু জিনিস শিখেছিলাম৷ যেমন, আমরা বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোতাম না, অনলাইনে কাজ করতাম৷ এগুলো করলে তো ভালোই হয়৷ এতে অফিস যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবহার কমে, জ্বালানির সাশ্রয় হয়৷ এর ফলে পরিবেশ দূষণও কম হবে৷ কোভিডের সময়ে আমরা কিছু কিছু জিনিস আয়ত্ত করেছিলাম, সেগুলো এখনো মেনে চললে সমস্যা কিছু দেখি না৷”
আবেদন না নীতি
সরকারি স্তরে শুধু অনুরোধ বা আবেদনের উপরে নির্ভর করলে হবে না বলে অনেক বিশেষজ্ঞের মত৷ তারা নীতি প্রণয়নের পক্ষপাতী৷
অর্থনীতিবিদ শুভনীল চৌধুরী ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘সরকারকে আগে নীতি ঠিক করতে হবে৷ গয়না কেনা বন্ধ করতে বললেই হবে না৷ অলংকার শিল্পের উপর বহু মানুষ নির্ভরশীল, সেটাও মাথায় রাখতে হবে৷ বিদেশ ভ্রমণ কি বন্ধ হয়ে যাবে? এতদিন তো বলা হচ্ছিল, সব ঠিকঠাক চলছে৷ কোনো সমস্যা নেই৷ প্রধানমন্ত্রীর কথায় প্রমাণ হচ্ছে, সব ঠিকঠাক চলছে না৷ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ কয়েক মাস আগে শুরু হয়েছে৷ তার আগেও টেনশন ছিল৷ যখন বাকিরা বলার চেষ্টা করেছেন যে সমস্যা রয়েছে, তখন সরকারের টনক নড়েনি৷ অরবিন্দ সুব্রমনিয়ম, রঘুরাম রাজনের মতো অর্থনীতিবিদরা আগেই সতর্ক করেছিলেন৷”
তিনি বলেন, ‘‘জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দেশে রাষ্ট্রপ্রধানরা নিয়মিত বলছিলেন কীভাবে সবকিছুতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে৷ কিন্তু আমরা এতদিন বলিনি৷ এখনো বলা হচ্ছে তেল ও গ্যাসের রিজার্ভ আছে৷ অর্থনীতির তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, বিদেশি মুদ্রা ভাণ্ডার সংকুচিত হচ্ছে৷ আমাদের এফডিআই আশানুরূপ নয়, এফআইআই টাকা নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর জন্য কেন্দ্র ও সব রাজ্যের মন্ত্রীরা গণপরিবহণে যাতায়াত করে নজির তৈরি করুন৷ আমাদের বাড়ির ছেলে বিদেশে পড়তে যাবে না, তা হলে মন্ত্রী বা ধনকুবের পরিবারের ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বন্ধ হোক৷ এটা আবেদনের স্তরে না রেখে নীতি প্রণয়ন করতে হবে সরকারকে৷”
ডিডাব্লিউ ডটকম
পায়েল সামন্ত ,কলকাতা 



















