০৮:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ ইরানের ফিফা বিশ্বকাপের টিকেট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৫ বাংলাদেশি আহত, দূতাবাস মাঠে ইরান-ইসরায়েল আবার থামল, কিন্তু শান্তি কতটা টেকসই? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে TIN বাধ্যতামূলক হচ্ছে, কোটি গ্রাহকের জীবনে বড় পরিবর্তন টাঙ্গাইলে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত নতুন নির্বাচন কমিশনে প্রাক্তন আমলার নাম, সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার শুনানি ১৬ জুন রামিসা হত্যা: ১৯ দিনে ফাঁসির রায়, দেশজুড়ে স্বস্তি ইসলামী ব্যাংকে সংকট: সাত দিনে উঠে গেল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই অর্থনীতির সংকট কমাবে?

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে এখন এক ধরনের অর্থনৈতিক আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, ব্যবসাকে আরও কার্যকর করবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারগুলোর কর রাজস্ব বাড়িয়ে দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতির চাপ কমিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ—অনেক নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস, প্রযুক্তিগত এই বিপ্লব অর্থনীতিকে এমন এক গতিতে এগিয়ে নেবে, যা বর্তমান ঋণ সংকটকে তুলনামূলকভাবে সামাল দেওয়া সহজ করে তুলবে।

কিন্তু এই আশাবাদের ভেতরে বেশ কিছু বিপজ্জনক সরলীকরণ লুকিয়ে আছে। ইতিহাস বলে, নতুন প্রযুক্তি কখনও শুধু সুবিধা নিয়ে আসে না; এর সঙ্গে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন, শ্রমবাজারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়। এআই নিয়েও সেই বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই লাভ কার হাতে যাবে? এআই এমন এক প্রযুক্তি, যা মূলধনের মালিকদের জন্য বিপুল সুবিধা তৈরি করতে পারে, কিন্তু শ্রমনির্ভর আয়কে তুলনামূলকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। যদি উৎপাদনের বড় অংশ ক্রমে মানুষের শ্রমের বদলে অ্যালগরিদম ও যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে মজুরিভিত্তিক কর আয়ও চাপের মুখে পড়বে। উন্নত দেশগুলোর কর কাঠামো এখনও বড় অংশে শ্রম আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি বড় হলেও সরকারের হাতে সেই অনুপাতে অর্থ নাও আসতে পারে।

How artificial intelligence could solve America's debt crisis | Stacker

তার ওপর আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। সরকারগুলো অতিরিক্ত রাজস্ব পেলে তারা সবসময় ঘাটতি কমাবে—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? ধনী দেশগুলোর বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি প্রমাণ করে, সমস্যা কেবল অর্থের ঘাটতি নয়; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বড় কারণ। বহু বছর ধরে কম সুদের পরিবেশে সরকারগুলো ব্যয় বাড়িয়েছে, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সুদের হার বেড়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমেছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খরচ দ্রুত বাড়ছে। এসব চাপের মধ্যে এআই থেকে বাড়তি আয় এলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়তো নতুন ব্যয়কেই উৎসাহিত করবে।

এআই বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রমবাজারে এর অভিঘাত। দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে মূলত কারখানা ও উৎপাদন খাতের শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু এবার চাপ পড়তে পারে সাদা-কলার পেশাজীবীদের ওপর—অফিসকর্মী, বিশ্লেষক, প্রোগ্রামার, এমনকি সৃজনশীল পেশার কর্মীরাও ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। অনেকেই অবশ্য যুক্তি দেন যে প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত নতুন কাজ তৈরি করে। ইতিহাসও আংশিকভাবে সেটাই দেখায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনের গতি কত দ্রুত হবে?

যদি চাকরি হারানোর ধাক্কা খুব অল্প সময়ের মধ্যে আসে, তাহলে শ্রমবাজারের অভিযোজন ক্ষমতা যথেষ্ট নাও হতে পারে। একজন মধ্যবয়সী প্রশাসনিক কর্মী বা হিসাবরক্ষক কি কয়েক মাসের মধ্যে নতুন দক্ষতা অর্জন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে কাজ শুরু করতে পারবেন? বাস্তবতা সম্ভবত এতটা সহজ নয়। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা তত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারছে না।

এখানেই সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়। যখন মানুষ মনে করে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভ বড় হয়ে ওঠে। উন্নত গণতন্ত্রগুলো ইতোমধ্যেই মেরুকরণ, অবিশ্বাস ও চরমপন্থার চাপে রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাপক চাকরি অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

AI financial crises | CEPR

অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও তথ্যব্যবস্থার প্রশ্নও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে ভুয়া ছবি, কণ্ঠ ও ভিডিও তৈরি করা ক্রমেই সহজ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অনলাইনে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক প্রচারণা, নির্বাচনী প্রভাব কিংবা সামাজিক সহিংসতা—সব ক্ষেত্রেই এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার কথা বললেও বাস্তবে প্রতিযোগিতার চাপ এত বেশি যে, দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

সামরিক ক্ষেত্রেও এআই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, অ্যালগরিদম-নির্ভর যুদ্ধ কৌশল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল মেশিনভিত্তিক সিদ্ধান্ত—এসব ভবিষ্যতের যুদ্ধকে আরও অনির্দেশ্য করে তুলতে পারে। যখন মানুষের বদলে যন্ত্র দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে, তখন ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়বে। আন্তর্জাতিক সমঝোতা ছাড়া এই প্রতিযোগিতা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। ভারতসহ বহু দেশ গত দুই দশকে সেবা খাত ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এআই যদি কম খরচে একই ধরনের কাজ করতে পারে, তাহলে এই মডেল বড় ধাক্কা খেতে পারে। অর্থাৎ যে খাত এতদিন উন্নয়নশীল অর্থনীতির শক্তি ছিল, সেটিই এখন ঝুঁকির জায়গা হয়ে উঠতে পারে।

What If AI Isn't A Bubble, But It Still Crashes The Economy?

অবশ্য কিছু দেশ এই পরিবর্তন থেকে বড় সুবিধাও পেতে পারে। যারা চিপ উৎপাদন, উন্নত প্রযুক্তি অবকাঠামো বা গবেষণায় এগিয়ে, তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যে খুব মসৃণ এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

এআই নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা কিংবা উৎপাদনে এর ইতিবাচক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তিকে ঘিরে অন্ধ আশাবাদ প্রায়ই বিপজ্জনক হয়। কারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক ভারসাম্য বা আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে না।

বরং ইতিহাস বলে, বড় প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সময় সমাজ সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। তাই এআই হয়তো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু তার আগে এটি ঋণ, বৈষম্য, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন চাপও তৈরি করতে পারে। আর সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই অর্থনীতির সংকট কমাবে?

০১:০১:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে ঘিরে এখন এক ধরনের অর্থনৈতিক আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, ব্যবসাকে আরও কার্যকর করবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারগুলোর কর রাজস্ব বাড়িয়ে দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতির চাপ কমিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ—অনেক নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীর বিশ্বাস, প্রযুক্তিগত এই বিপ্লব অর্থনীতিকে এমন এক গতিতে এগিয়ে নেবে, যা বর্তমান ঋণ সংকটকে তুলনামূলকভাবে সামাল দেওয়া সহজ করে তুলবে।

কিন্তু এই আশাবাদের ভেতরে বেশ কিছু বিপজ্জনক সরলীকরণ লুকিয়ে আছে। ইতিহাস বলে, নতুন প্রযুক্তি কখনও শুধু সুবিধা নিয়ে আসে না; এর সঙ্গে ক্ষমতার পুনর্বণ্টন, শ্রমবাজারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক চাপও তৈরি হয়। এআই নিয়েও সেই বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই লাভ কার হাতে যাবে? এআই এমন এক প্রযুক্তি, যা মূলধনের মালিকদের জন্য বিপুল সুবিধা তৈরি করতে পারে, কিন্তু শ্রমনির্ভর আয়কে তুলনামূলকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। যদি উৎপাদনের বড় অংশ ক্রমে মানুষের শ্রমের বদলে অ্যালগরিদম ও যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে মজুরিভিত্তিক কর আয়ও চাপের মুখে পড়বে। উন্নত দেশগুলোর কর কাঠামো এখনও বড় অংশে শ্রম আয়ের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি বড় হলেও সরকারের হাতে সেই অনুপাতে অর্থ নাও আসতে পারে।

How artificial intelligence could solve America's debt crisis | Stacker

তার ওপর আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। সরকারগুলো অতিরিক্ত রাজস্ব পেলে তারা সবসময় ঘাটতি কমাবে—এমন নিশ্চয়তা কোথায়? ধনী দেশগুলোর বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি প্রমাণ করে, সমস্যা কেবল অর্থের ঘাটতি নয়; রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও বড় কারণ। বহু বছর ধরে কম সুদের পরিবেশে সরকারগুলো ব্যয় বাড়িয়েছে, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। সুদের হার বেড়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমেছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বেড়েছে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খরচ দ্রুত বাড়ছে। এসব চাপের মধ্যে এআই থেকে বাড়তি আয় এলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়তো নতুন ব্যয়কেই উৎসাহিত করবে।

এআই বিপ্লবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রমবাজারে এর অভিঘাত। দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে মূলত কারখানা ও উৎপাদন খাতের শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু এবার চাপ পড়তে পারে সাদা-কলার পেশাজীবীদের ওপর—অফিসকর্মী, বিশ্লেষক, প্রোগ্রামার, এমনকি সৃজনশীল পেশার কর্মীরাও ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। অনেকেই অবশ্য যুক্তি দেন যে প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত নতুন কাজ তৈরি করে। ইতিহাসও আংশিকভাবে সেটাই দেখায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনের গতি কত দ্রুত হবে?

যদি চাকরি হারানোর ধাক্কা খুব অল্প সময়ের মধ্যে আসে, তাহলে শ্রমবাজারের অভিযোজন ক্ষমতা যথেষ্ট নাও হতে পারে। একজন মধ্যবয়সী প্রশাসনিক কর্মী বা হিসাবরক্ষক কি কয়েক মাসের মধ্যে নতুন দক্ষতা অর্জন করে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে কাজ শুরু করতে পারবেন? বাস্তবতা সম্ভবত এতটা সহজ নয়। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা তত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারছে না।

এখানেই সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়। যখন মানুষ মনে করে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভ বড় হয়ে ওঠে। উন্নত গণতন্ত্রগুলো ইতোমধ্যেই মেরুকরণ, অবিশ্বাস ও চরমপন্থার চাপে রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাপক চাকরি অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

AI financial crises | CEPR

অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও তথ্যব্যবস্থার প্রশ্নও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে ভুয়া ছবি, কণ্ঠ ও ভিডিও তৈরি করা ক্রমেই সহজ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অনলাইনে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা দুর্বল হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক প্রচারণা, নির্বাচনী প্রভাব কিংবা সামাজিক সহিংসতা—সব ক্ষেত্রেই এর অপব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার কথা বললেও বাস্তবে প্রতিযোগিতার চাপ এত বেশি যে, দ্রুত এগিয়ে যাওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

সামরিক ক্ষেত্রেও এআই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। স্বয়ংক্রিয় ড্রোন, অ্যালগরিদম-নির্ভর যুদ্ধ কৌশল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল মেশিনভিত্তিক সিদ্ধান্ত—এসব ভবিষ্যতের যুদ্ধকে আরও অনির্দেশ্য করে তুলতে পারে। যখন মানুষের বদলে যন্ত্র দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে, তখন ভুল হিসাবের ঝুঁকিও বাড়বে। আন্তর্জাতিক সমঝোতা ছাড়া এই প্রতিযোগিতা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। ভারতসহ বহু দেশ গত দুই দশকে সেবা খাত ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এআই যদি কম খরচে একই ধরনের কাজ করতে পারে, তাহলে এই মডেল বড় ধাক্কা খেতে পারে। অর্থাৎ যে খাত এতদিন উন্নয়নশীল অর্থনীতির শক্তি ছিল, সেটিই এখন ঝুঁকির জায়গা হয়ে উঠতে পারে।

What If AI Isn't A Bubble, But It Still Crashes The Economy?

অবশ্য কিছু দেশ এই পরিবর্তন থেকে বড় সুবিধাও পেতে পারে। যারা চিপ উৎপাদন, উন্নত প্রযুক্তি অবকাঠামো বা গবেষণায় এগিয়ে, তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাড়তি সুবিধা পাবে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিশ্ব অর্থনীতি যে খুব মসৃণ এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

এআই নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গবেষণা কিংবা উৎপাদনে এর ইতিবাচক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তিকে ঘিরে অন্ধ আশাবাদ প্রায়ই বিপজ্জনক হয়। কারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক ভারসাম্য বা আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে না।

বরং ইতিহাস বলে, বড় প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সময় সমাজ সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে ওঠে। তাই এআই হয়তো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু তার আগে এটি ঋণ, বৈষম্য, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন চাপও তৈরি করতে পারে। আর সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করলে ভবিষ্যতের সংকট আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।