০৮:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
রঘু রাইয়ের ক্যামেরা ছিল শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়, এক ধরনের জীবনদর্শন চীনা মালিকানায় গেল ১২০ বছরের জার্মান টেক্সটাইল যন্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সরকারের ‘মেরুদণ্ড’ থাকলে মার্কিন চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে: ফজলুর রহমান অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে হলিউডের জোয়ার, বিশ্ব চলচ্চিত্রের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে কুইন্সল্যান্ড বাংলাদেশকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের সিমুলেটর দিল পাকিস্তান, বাড়ছে সামরিক সহযোগিতার জল্পনা বিএসএফের হাতে আটক ১০ বাংলাদেশিকে ফেরত দিল ভারত, হালুয়াঘাটে বিজিবির কাছে হস্তান্তর হাম পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ শিশুর মৃত্যু শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে: নাসিরউদ্দিন পাটওয়ারী ‘ধলতা’ নামে অতিরিক্ত ওজন, নীরবে সর্বস্ব হারাচ্ছেন কৃষক খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং ও সাইবার সিকিউরিটি অলিম্পিয়াড

কঙ্গোর কোবাল্ট থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি: ‘সবুজ জ্বালানি’র অন্ধকার দিক উন্মোচন

বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে দ্রুত সবুজ জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন সেই পরিবর্তনের পেছনে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ল্যাপটপ কিংবা উইন্ড টারবাইনের জন্য প্রয়োজনীয় কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা ও টাংস্টেনের মতো খনিজ আহরণের প্রক্রিয়া যে কতটা নির্মম ও অমানবিক হতে পারে, তা উঠে এসেছে সাংবাদিক ও লেখক নিকোলাস নিয়ারকোসের বই The Elements of Power-এ।

বইটির আলোচনায় উঠে এসেছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নামে যে নতুন শিল্পবিপ্লব তৈরি হচ্ছে, তা বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে পুরোনো তেল ও খনিজ শিল্পের শোষণকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনছে। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে কোবাল্ট খনিকে ঘিরে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

কোবাল্টের জন্য কঙ্গো কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বের মোট কোবাল্টের ৭০ শতাংশের বেশি আসে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তিতে কোবাল্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দক্ষিণ কঙ্গোর কাটাঙ্গা অঞ্চলের কলওয়েজি শহরকে বর্তমানে এই খনিজ উত্তোলনের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়।

কিন্তু সেই খনিগুলোর বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, খনিজের ধুলাবালি ও রাসায়নিক দূষণে শিশুদের শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বহু শিশু ও কিশোর খনিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। দুর্ঘটনা, ধস এবং বিষাক্ত পরিবেশ সেখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ভূমিকা

বইটিতে অ্যাপল, টেসলা, মাইক্রোসফট ও সনির মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কথাও এসেছে। লেখকের মতে, এসব কোম্পানি সরাসরি খনির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও জটিল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে তারা কার্যত সেই শোষণমূলক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে।

নিকোলাস নিয়ারকোস দেখিয়েছেন, খনিজ কোথা থেকে আসছে কিংবা কীভাবে উত্তোলন হচ্ছে—এসব বিষয়ে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানই পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয় না। বরং কে আগে এসব খনিজ দখল করতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Manufacturing Electric Cars Comes at an Ethical Cost

ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে বর্তমান ভূরাজনীতি

কঙ্গোর খনিজ সম্পদ নিয়ে শোষণের ইতিহাস নতুন নয়। উনিশ শতকে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। রাবার আহরণের নামে তখন ব্যাপক নির্যাতন ও লুটপাট চালানো হয়।

বইটিতে বলা হয়েছে, সেই শোষণ কাঠামো আজও পুরোপুরি বদলায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে নতুন শক্তিগুলো সেখানে প্রভাব বিস্তার করেছে। বর্তমানে চীন কঙ্গোর খনিজ শিল্পে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও কঙ্গোর সম্পদকে ঘিরে আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সবুজ জ্বালানির মূল্য কতটা মানবিক?

নিকোলাস নিয়ারকোস বইটির শেষে একটি গণকবরের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে খনির সুড়ঙ্গ ধসে মারা যাওয়া শ্রমিকদের দাফন করা হয়েছিল। এই ঘটনাকে তিনি সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের নির্মম প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তার মতে, বিশ্ব হয়তো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিত্তি যদি শ্রমিকের রক্ত, শিশুশ্রম ও পরিবেশ ধ্বংসের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে সেটিকে পুরোপুরি নৈতিক বলা কঠিন। পরিচ্ছন্ন শক্তির ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, মানবাধিকার ও ন্যায্য খনিজ ব্যবস্থাপনাও সমান জরুরি হয়ে উঠছে।

সবুজ জ্বালানির আড়ালে কঙ্গোর কোবাল্ট খনিতে মানবিক সংকট ও করপোরেট শোষণের বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

রঘু রাইয়ের ক্যামেরা ছিল শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়, এক ধরনের জীবনদর্শন

কঙ্গোর কোবাল্ট থেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি: ‘সবুজ জ্বালানি’র অন্ধকার দিক উন্মোচন

০৬:২৪:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে দ্রুত সবুজ জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখন সেই পরিবর্তনের পেছনে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ল্যাপটপ কিংবা উইন্ড টারবাইনের জন্য প্রয়োজনীয় কোবাল্ট, লিথিয়াম, তামা ও টাংস্টেনের মতো খনিজ আহরণের প্রক্রিয়া যে কতটা নির্মম ও অমানবিক হতে পারে, তা উঠে এসেছে সাংবাদিক ও লেখক নিকোলাস নিয়ারকোসের বই The Elements of Power-এ।

বইটির আলোচনায় উঠে এসেছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নামে যে নতুন শিল্পবিপ্লব তৈরি হচ্ছে, তা বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে পুরোনো তেল ও খনিজ শিল্পের শোষণকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনছে। বিশেষ করে আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে কোবাল্ট খনিকে ঘিরে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

কোবাল্টের জন্য কঙ্গো কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বের মোট কোবাল্টের ৭০ শতাংশের বেশি আসে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লিথিয়াম-আয়ন প্রযুক্তিতে কোবাল্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দক্ষিণ কঙ্গোর কাটাঙ্গা অঞ্চলের কলওয়েজি শহরকে বর্তমানে এই খনিজ উত্তোলনের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়।

কিন্তু সেই খনিগুলোর বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, খনিজের ধুলাবালি ও রাসায়নিক দূষণে শিশুদের শরীরে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বহু শিশু ও কিশোর খনিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। দুর্ঘটনা, ধস এবং বিষাক্ত পরিবেশ সেখানে প্রতিদিনের বাস্তবতা।

বড় প্রযুক্তি কোম্পানির ভূমিকা

বইটিতে অ্যাপল, টেসলা, মাইক্রোসফট ও সনির মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কথাও এসেছে। লেখকের মতে, এসব কোম্পানি সরাসরি খনির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও জটিল সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে তারা কার্যত সেই শোষণমূলক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে।

নিকোলাস নিয়ারকোস দেখিয়েছেন, খনিজ কোথা থেকে আসছে কিংবা কীভাবে উত্তোলন হচ্ছে—এসব বিষয়ে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানই পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয় না। বরং কে আগে এসব খনিজ দখল করতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতাই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Manufacturing Electric Cars Comes at an Ethical Cost

ঔপনিবেশিক ইতিহাস থেকে বর্তমান ভূরাজনীতি

কঙ্গোর খনিজ সম্পদ নিয়ে শোষণের ইতিহাস নতুন নয়। উনিশ শতকে বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। রাবার আহরণের নামে তখন ব্যাপক নির্যাতন ও লুটপাট চালানো হয়।

বইটিতে বলা হয়েছে, সেই শোষণ কাঠামো আজও পুরোপুরি বদলায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে নতুন শক্তিগুলো সেখানে প্রভাব বিস্তার করেছে। বর্তমানে চীন কঙ্গোর খনিজ শিল্পে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও কঙ্গোর সম্পদকে ঘিরে আরও জটিল হয়ে উঠছে।

সবুজ জ্বালানির মূল্য কতটা মানবিক?

নিকোলাস নিয়ারকোস বইটির শেষে একটি গণকবরের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে খনির সুড়ঙ্গ ধসে মারা যাওয়া শ্রমিকদের দাফন করা হয়েছিল। এই ঘটনাকে তিনি সবুজ জ্বালানি রূপান্তরের নির্মম প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তার মতে, বিশ্ব হয়তো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিত্তি যদি শ্রমিকের রক্ত, শিশুশ্রম ও পরিবেশ ধ্বংসের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে সেটিকে পুরোপুরি নৈতিক বলা কঠিন। পরিচ্ছন্ন শক্তির ভবিষ্যৎ গড়তে হলে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, মানবাধিকার ও ন্যায্য খনিজ ব্যবস্থাপনাও সমান জরুরি হয়ে উঠছে।

সবুজ জ্বালানির আড়ালে কঙ্গোর কোবাল্ট খনিতে মানবিক সংকট ও করপোরেট শোষণের বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে।