০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বপ্ন অনিশ্চিত, রেমিট্যান্সেও চাপ ইরানের ফিফা বিশ্বকাপের টিকেট বাতিল করল যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতে ড্রোন হামলায় ৫ বাংলাদেশি আহত, দূতাবাস মাঠে ইরান-ইসরায়েল আবার থামল, কিন্তু শান্তি কতটা টেকসই? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে TIN বাধ্যতামূলক হচ্ছে, কোটি গ্রাহকের জীবনে বড় পরিবর্তন টাঙ্গাইলে পিকআপ-ট্রাক সংঘর্ষে ৪ জন নিহত নতুন নির্বাচন কমিশনে প্রাক্তন আমলার নাম, সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার শুনানি ১৬ জুন রামিসা হত্যা: ১৯ দিনে ফাঁসির রায়, দেশজুড়ে স্বস্তি ইসলামী ব্যাংকে সংকট: সাত দিনে উঠে গেল ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি

‘ধলতা’ নামে অতিরিক্ত ওজন, নীরবে সর্বস্ব হারাচ্ছেন কৃষক

বাংলাদেশের গ্রামীণ হাট-বাজারে কৃষকের সবচেয়ে বড় লড়াই এখন শুধু উৎপাদন খরচ বা বাজারদর নিয়ে নয়, বরং ওজনের পাল্লা নিয়েও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিপণ্য বিক্রির সময় কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার যে অলিখিত নিয়ম চালু রয়েছে, স্থানীয় ভাষায় সেটিই পরিচিত ‘ধলতা’ নামে। সরকারি হিসাবে ৪০ কেজিতে এক মণ হলেও বাস্তবে কৃষকদের অনেক জায়গায় দিতে হচ্ছে ৪২ কেজি, কোথাও কোথাও আরও বেশি। ফলে বছরের পর বছর ধরে কোটি টাকার ক্ষতির বোঝা বইছেন চাষিরা।

সম্প্রতি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও খানখানাপুরের পেঁয়াজ বাজারে ‘ধলতা’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি মণে দুই কেজি অতিরিক্ত পণ্য নেওয়া হচ্ছে, অথচ দাম দেওয়া হচ্ছে ৪০ কেজির হিসাবেই। শুধু পেঁয়াজ নয়, ধান, পাট, ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

রাজবাড়ী থেকে নীলফামারী: একই অভিযোগ

এই সমস্যা শুধু রাজবাড়ীতেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলাতেও কৃষকেরা একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। সেখানে বিভিন্ন হাটে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪২ কেজিতে মণ ধরা হচ্ছে। ৫০ কেজি পণ্য বিক্রি করলেও হিসাব ধরা হচ্ছে ৪৭ কেজি। এমনকি ৬০ কেজির বেশি হলে কাটতির পরিমাণ আরও বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিমলার খগার হাট, ডাঙ্গারহাট, কালীগঞ্জ হাট, শুটিবাড়ি বাজারসহ প্রায় সব বাজারেই একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে অপমান, দুর্ব্যবহার, এমনকি পণ্য না কেনার হুমকিও দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়েই তারা এই অনিয়ম মেনে নিচ্ছেন।

‘শুকনা’ আর ‘ধলতা’র যুক্তি

ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান। তাদের দাবি, পেঁয়াজ বা অন্যান্য কাঁচাপণ্য বাজারে আনার পর বাতাসে শুকিয়ে ওজন কমে যায়। সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। সেই সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই ‘ধলতা’ নেওয়া হয়।

তবে কৃষকদের প্রশ্ন, ব্যবসার ঝুঁকি কেন শুধু উৎপাদনকারীকেই বহন করতে হবে? তারা বলছেন, সার, সেচ, শ্রমিক, পরিবহন—সব খরচ বহন করার পর বাজারে এসে যদি আবার অতিরিক্ত দুই-তিন কেজি পণ্য বিনা দামে দিতে হয়, তাহলে লাভের অংশ বলতে কিছুই থাকে না।

রায়গঞ্জের ধানের হাটে ৪২ কেজিতে মন! সিন্ডিকেটের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

খাজনা, ওজন কারচুপি ও মধ্যস্বত্বভোগী

বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা জানিয়েছেন, ধলতার পাশাপাশি প্রতি মণে আলাদা করে খাজনাও দিতে হয়। কোথাও কোথাও বাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা বহনকারীরাও কৃষকদের বস্তা থেকে অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে যান। পুরোনো দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা ব্যবহারের কারণে ওজন কারচুপির সুযোগও থেকে যাচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের কৃষিপণ্যের বাজার এখনও মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তনির্ভর। কৃষক উৎপাদন করলেও বিক্রির শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা তার হাতে নেই। ফলে বাজারে দর কমলে যেমন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি ওজনের অনিয়মও তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সরকারের নজরে বিষয়টি

কৃষকদের অভিযোগ সামনে আসার পর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজ ও আমসহ নানা কৃষিপণ্য কেনাবেচায় ৪০ কেজিতে ২ থেকে ৬ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা আইনত দণ্ডনীয়। এ বিষয়ে সারাদেশের কৃষি বিপণন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ীতে প্রশাসনের উদ্যোগে ব্যবসায়ী, বাজার কমিটি ও কৃষকদের নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত পণ্য আদায় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অনেকে মনে করেন, শুধু বৈঠক বা নির্দেশনায় এই বহু বছরের প্রথা বন্ধ হবে না। নিয়মিত বাজার তদারকি, ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং কৃষকদের সরাসরি বিক্রির সুযোগ বাড়ানো ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন।

কৃষকের ন্যায্য হিস্যার প্রশ্ন

বাংলাদেশের কৃষি খাত এখনও দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নেওয়া মানুষটিই বাজার ব্যবস্থায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন। প্রতিটি মণে দুই কেজি অতিরিক্ত পণ্য হয়তো শুনতে সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু লাখ লাখ মণ কৃষিপণ্যের হিসাবে এটি বিশাল আর্থিক ক্ষতি।

গ্রামের হাটে দাঁড়িয়ে কৃষকেরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—যে দেশে খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব তাদের কাঁধে, সেই দেশের বাজারে ন্যায্য ওজনটুকুও কি তারা পাবেন না?

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা: বিশেষ অংশীদারিত্ব থেকে হিসাবি লেনদেনের পথে

‘ধলতা’ নামে অতিরিক্ত ওজন, নীরবে সর্বস্ব হারাচ্ছেন কৃষক

০৭:১৫:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

বাংলাদেশের গ্রামীণ হাট-বাজারে কৃষকের সবচেয়ে বড় লড়াই এখন শুধু উৎপাদন খরচ বা বাজারদর নিয়ে নয়, বরং ওজনের পাল্লা নিয়েও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিপণ্য বিক্রির সময় কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার যে অলিখিত নিয়ম চালু রয়েছে, স্থানীয় ভাষায় সেটিই পরিচিত ‘ধলতা’ নামে। সরকারি হিসাবে ৪০ কেজিতে এক মণ হলেও বাস্তবে কৃষকদের অনেক জায়গায় দিতে হচ্ছে ৪২ কেজি, কোথাও কোথাও আরও বেশি। ফলে বছরের পর বছর ধরে কোটি টাকার ক্ষতির বোঝা বইছেন চাষিরা।

সম্প্রতি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও খানখানাপুরের পেঁয়াজ বাজারে ‘ধলতা’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি মণে দুই কেজি অতিরিক্ত পণ্য নেওয়া হচ্ছে, অথচ দাম দেওয়া হচ্ছে ৪০ কেজির হিসাবেই। শুধু পেঁয়াজ নয়, ধান, পাট, ভুট্টা, আলুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

রাজবাড়ী থেকে নীলফামারী: একই অভিযোগ

এই সমস্যা শুধু রাজবাড়ীতেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলাতেও কৃষকেরা একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। সেখানে বিভিন্ন হাটে ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪২ কেজিতে মণ ধরা হচ্ছে। ৫০ কেজি পণ্য বিক্রি করলেও হিসাব ধরা হচ্ছে ৪৭ কেজি। এমনকি ৬০ কেজির বেশি হলে কাটতির পরিমাণ আরও বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিমলার খগার হাট, ডাঙ্গারহাট, কালীগঞ্জ হাট, শুটিবাড়ি বাজারসহ প্রায় সব বাজারেই একই চিত্র দেখা গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করলে অপমান, দুর্ব্যবহার, এমনকি পণ্য না কেনার হুমকিও দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়েই তারা এই অনিয়ম মেনে নিচ্ছেন।

‘শুকনা’ আর ‘ধলতা’র যুক্তি

ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখান। তাদের দাবি, পেঁয়াজ বা অন্যান্য কাঁচাপণ্য বাজারে আনার পর বাতাসে শুকিয়ে ওজন কমে যায়। সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। সেই সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই ‘ধলতা’ নেওয়া হয়।

তবে কৃষকদের প্রশ্ন, ব্যবসার ঝুঁকি কেন শুধু উৎপাদনকারীকেই বহন করতে হবে? তারা বলছেন, সার, সেচ, শ্রমিক, পরিবহন—সব খরচ বহন করার পর বাজারে এসে যদি আবার অতিরিক্ত দুই-তিন কেজি পণ্য বিনা দামে দিতে হয়, তাহলে লাভের অংশ বলতে কিছুই থাকে না।

রায়গঞ্জের ধানের হাটে ৪২ কেজিতে মন! সিন্ডিকেটের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

খাজনা, ওজন কারচুপি ও মধ্যস্বত্বভোগী

বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা জানিয়েছেন, ধলতার পাশাপাশি প্রতি মণে আলাদা করে খাজনাও দিতে হয়। কোথাও কোথাও বাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা বহনকারীরাও কৃষকদের বস্তা থেকে অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে যান। পুরোনো দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা ব্যবহারের কারণে ওজন কারচুপির সুযোগও থেকে যাচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশের কৃষিপণ্যের বাজার এখনও মধ্যস্বত্বভোগী ও আড়তনির্ভর। কৃষক উৎপাদন করলেও বিক্রির শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা তার হাতে নেই। ফলে বাজারে দর কমলে যেমন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি ওজনের অনিয়মও তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

সরকারের নজরে বিষয়টি

কৃষকদের অভিযোগ সামনে আসার পর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁয়াজ ও আমসহ নানা কৃষিপণ্য কেনাবেচায় ৪০ কেজিতে ২ থেকে ৬ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পণ্য নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা আইনত দণ্ডনীয়। এ বিষয়ে সারাদেশের কৃষি বিপণন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ীতে প্রশাসনের উদ্যোগে ব্যবসায়ী, বাজার কমিটি ও কৃষকদের নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। সেখানে অতিরিক্ত পণ্য আদায় বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অনেকে মনে করেন, শুধু বৈঠক বা নির্দেশনায় এই বহু বছরের প্রথা বন্ধ হবে না। নিয়মিত বাজার তদারকি, ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং কৃষকদের সরাসরি বিক্রির সুযোগ বাড়ানো ছাড়া স্থায়ী সমাধান কঠিন।

কৃষকের ন্যায্য হিস্যার প্রশ্ন

বাংলাদেশের কৃষি খাত এখনও দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি নেওয়া মানুষটিই বাজার ব্যবস্থায় সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন। প্রতিটি মণে দুই কেজি অতিরিক্ত পণ্য হয়তো শুনতে সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু লাখ লাখ মণ কৃষিপণ্যের হিসাবে এটি বিশাল আর্থিক ক্ষতি।

গ্রামের হাটে দাঁড়িয়ে কৃষকেরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—যে দেশে খাদ্য উৎপাদনের দায়িত্ব তাদের কাঁধে, সেই দেশের বাজারে ন্যায্য ওজনটুকুও কি তারা পাবেন না?