দীর্ঘ সময় শান্ত থাকার পর আবারও সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিক জাহাজে হামলা, জিম্মি করা এবং মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় ভারত মহাসাগর ও এডেন উপসাগরজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বছরের শুরুতে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর এপ্রিল ও মে মাসে হামলার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জলদস্যুরা দূর সমুদ্রে অভিযান চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। সম্প্রতি ইয়েমেনের জলসীমায় নোঙর করা একটি তেলবাহী জাহাজ দখল করে নেয় সশস্ত্র জলদস্যুরা। পরে জাহাজ ও নাবিকদের মুক্তির জন্য বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
সমুদ্রপথে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোমালিয়ার উত্তর উপকূলে জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার দুর্বলতা কাজে লাগাচ্ছে জলদস্যুরা। বিশেষ করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর সঙ্গে যেসব তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে, সেগুলো এখন বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ এসব জাহাজে থাকা পণ্য ও নাবিকদের মুক্তিপণ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের সুযোগ থাকে।
এদিকে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো পর্যাপ্ত সশস্ত্র নিরাপত্তা ব্যবহার করছে না। এতে উপকূলের কাছাকাছি চলাচলকারী জাহাজগুলো আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। সাম্প্রতিক দুটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও এমন দুর্বলতা সামনে এসেছে।
কেন ফিরছে জলদস্যুতা
বিশ্লেষকদের মতে, সোমালিয়ার উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সংকট জলদস্যুতা ফের মাথাচাড়া দেওয়ার অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ মাছ শিকার, দুর্বল সামুদ্রিক নজরদারি এবং স্থানীয় জীবিকার সংকটে বহু মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় কেউ দেশ ছাড়ছে, আবার কেউ জলদস্যু চক্রে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয়ভাবে অনেক জলদস্যু নিজেদের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবেও তুলে ধরছে। কারণ সোমালিয়ার সমুদ্র এলাকায় উচ্চমূল্যের মাছের বিশাল মজুত থাকলেও সেগুলোর সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি নেই।
আন্তর্জাতিক টহলেও সীমাবদ্ধতা
২০০৮ সালের পর আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর যৌথ টহল, বাণিজ্যিক জাহাজে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় প্রশাসনের কঠোরতার কারণে সোমালিয়ার জলদস্যুতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও লোহিত সাগর ঘিরে নতুন উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর বড় অংশ অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে সোমালিয়া উপকূলে নজরদারি দুর্বল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সামরিক টহল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জলদস্যুতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য সোমালিয়ায় কার্যকর প্রশাসন, উপকূলীয় নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক পুনর্বাসন জরুরি।
তুরস্কের বাড়তি ভূমিকা
সাম্প্রতিক সময়ে সোমালিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তায় তুরস্কের সক্রিয়তা বেড়েছে। সোমালিয়া সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে দেশটির জলসীমা নিরাপত্তায় তুর্কি নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চলতি বছরও এডেন উপসাগর ও আশপাশের এলাকায় তুর্কি নৌবাহিনীর কার্যক্রমের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যদি বর্তমান হামলাগুলোর পর মুক্তিপণ আদায় সফল হয়, তাহলে আরও নতুন জলদস্যু চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এতে পশ্চিম ভারত মহাসাগরজুড়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তা আবারও বড় সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রপথে নতুন করে বাড়তে থাকা এই জলদস্যু তৎপরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















