দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে আফগানিস্তান বহুদিন ধরেই এক অস্থির ভূখণ্ড। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের জন্য এই অস্থিরতা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতি, রাজনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত ভবিষ্যতের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) কিংবা নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী ইতেহাদ-ই-মুজাহিদিন-ই-পাকিস্তান (আইএমপি)-এর ধারাবাহিক হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। বরং এই যুদ্ধ নতুন রূপে আরও জটিল হয়ে উঠছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী গত কয়েক বছরে নানা সামরিক অভিযান চালিয়ে জঙ্গি নেটওয়ার্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। “অপারেশন গজব লিল হক” সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সামরিক অভিযান কেবল সাময়িক চাপ তৈরি করতে পারে; দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য দরকার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামাজিক কৌশলের সমন্বয়। এই জায়গাতেই পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিচ্ছে।
আফগানিস্তানের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। তালেবান সরকারকে বাইরে থেকে একক শক্তি মনে হলেও বাস্তবে সেটি বিভিন্ন গোষ্ঠীর ভেতরকার ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় বিভক্ত। কান্দাহারি নেতৃত্ব, হাক্কানি নেটওয়ার্ক, উত্তরাঞ্চলভিত্তিক প্রতিরোধ গোষ্ঠী—প্রত্যেকেই নিজস্ব প্রভাব বলয় বিস্তারে ব্যস্ত। এই বিভক্ত বাস্তবতায় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো শুধু টিকে নেই, বরং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে আরও কার্যকর হয়ে উঠছে। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং অর্থায়নের বিনিময় তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আফগান ভূখণ্ডে কার্যরত বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী এখন প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। নিয়োগ, প্রচারণা এবং হামলার পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল পরিসর তাদের জন্য কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের প্রচলিত সামরিক প্রতিক্রিয়া এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। ফলে সীমান্তে সামরিক চাপ থাকলেও মতাদর্শিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষেত্রে জঙ্গিরা এখনও সক্রিয়।

তবে এই সংকটকে শুধু সীমান্তপারের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলে ভুল হবে। পাকিস্তানের ভেতরেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল প্রশাসন এবং অনুন্নয়ন সন্ত্রাসবাদের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। খাইবার পাখতুনখোয়ার একীভূত জেলাগুলোতে জনগণ এখনও নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার মধ্যে বাস করছে। রাষ্ট্র যখন উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় ভয়, ক্ষোভ এবং উপজাতীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
এই বাস্তবতা পাকিস্তানের জন্য একটি কঠিন সত্য সামনে আনে: সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ কেবল বন্দুকের লড়াই নয়। এটি একই সঙ্গে জনসমর্থন, রাষ্ট্রের বৈধতা এবং রাজনৈতিক আস্থার লড়াই। জনগণ যদি রাষ্ট্রকে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য মনে না করে, তবে নিরাপত্তা অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। এজন্যই শুধু সামরিক শক্তি নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই দ্বিমুখী কাজ রয়েছে। একদিকে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হবে; অন্যদিকে আফগান তালেবানের ভেতরে প্রভাবশালী অংশগুলোর সঙ্গে বাস্তববাদী কূটনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে চীন, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। কারণ আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতা এখন আর একক কোনো দেশের সমস্যা নয়; এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে যায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য নিয়ে। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই যদি দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা কেন্দ্র-প্রদেশ দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে যায়, তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীর সাফল্যও সীমিত হয়ে পড়বে। একটি কার্যকর জাতীয় কৌশল গড়ে তুলতে হলে ফেডারেল সরকার, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রশাসন এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাস্তব সহযোগিতা প্রয়োজন।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত পাকিস্তানকে শিখিয়েছে যে সন্ত্রাসবাদ শুধু সীমান্তের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভেতরের দুর্বলতাকেও উন্মোচিত করে। আফগানিস্তানের মাটিতে যে অস্থিরতা জন্ম নেয়, তার প্রতিধ্বনি দ্রুতই পাকিস্তানের শহর, বাজার ও জনজীবনে পৌঁছে যায়। তাই এই যুদ্ধের সমাধানও কেবল সামরিক বিজয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার শক্তিশালী রাষ্ট্র পরিচালনা, আঞ্চলিক কূটনীতি, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং সবচেয়ে বড় কথা—জনগণের আস্থা পুনর্গঠন।
ড. রাশিদ ওয়ালি জানজুয়া 



















