বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম প্যাঙ্গোলিন। বন উজাড়, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক পাচারের কারণে প্রাণীটি এখন চরম হুমকির মুখে। এমন পরিস্থিতিতে পাচারের উৎস ও রুট শনাক্ত করতে বড় অগ্রগতির দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় আন্তর্জাতিক গবেষক দল উন্নত জিন বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনটি বহুল পাচার হওয়া প্যাঙ্গোলিন প্রজাতির পাচার রুট চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাদা-পেট প্যাঙ্গোলিন, সুন্ডা প্যাঙ্গোলিন এবং চীনা প্যাঙ্গোলিন।
ডিএনএ বিশ্লেষণে নতুন পদ্ধতি
সাধারণত বিমানবন্দর বা সীমান্তে জব্দ হওয়া প্যাঙ্গোলিনের আঁশ থেকে নির্দিষ্ট উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ এসব নমুনার ডিএনএ অনেক সময় নষ্ট বা দুর্বল অবস্থায় থাকে। নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্যাঙ্গোলিনের জিনোমের নির্দিষ্ট ৬৭১টি অংশ বিশ্লেষণ করেন, যেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের প্যাঙ্গোলিনকে আলাদা করে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
গবেষকরা ১২২টি জাদুঘরের নমুনাসহ শত শত নতুন নমুনা ব্যবহার করে একটি বিস্তৃত ডিএনএ ডেটাবেস তৈরি করেছেন। এই ডেটাবেস এখন এক ধরনের “জেনেটিক মানচিত্র” হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে পাচার হওয়া প্যাঙ্গোলিনের উৎস অনেক বেশি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পাচারের যোগসূত্র
গবেষণায় উঠে এসেছে পাচারের একটি জটিল চিত্র। আগে ধারণা করা হতো স্থানীয় বাজারের জন্য প্যাঙ্গোলিন পাচার এবং আন্তর্জাতিক পাচার আলাদা দুটি সমস্যা। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, একই অঞ্চল অনেক সময় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের পাচারেরই উৎস হিসেবে কাজ করছে।
গবেষণা অনুযায়ী, দেশীয় বাজারে প্যাঙ্গোলিন গড়ে ৪৫৪ কিলোমিটার দূরে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে এসব অঞ্চল থেকেই আন্তর্জাতিক পাচারকারীরা প্রাণী ও আঁশ সংগ্রহ করছে।

তিনটি বড় পাচার কেন্দ্র শনাক্ত
গবেষকরা তিনটি বড় আন্তর্জাতিক পাচার কেন্দ্রও শনাক্ত করেছেন। সাদা-পেট প্যাঙ্গোলিনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পশ্চিম ক্যামেরুন, সুন্ডা প্যাঙ্গোলিনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পশ্চিম বোর্নিও এবং চীনা প্যাঙ্গোলিনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের আশপাশের অঞ্চলকে প্রধান পাচারকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, পাচারকারীরা কাছাকাছি বিভিন্ন এলাকার প্যাঙ্গোলিনের আঁশ সংগ্রহ করে পরে সেগুলো বিশ্বজুড়ে পাঠায়। এর প্রধান গন্তব্য চীন ও ভিয়েতনাম।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ
গবেষণায় উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু এলাকার কথাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের আশপাশের অঞ্চল থেকে পাচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুটানের সংযোগও থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী পাচার রোধে নতুন আশা
বিশ্বব্যাপী অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এখন বহু বিলিয়ন ডলারের অপরাধচক্রে পরিণত হয়েছে। এতদিন পাচারের মূল উৎস শনাক্তে যথেষ্ট প্রমাণের অভাব ছিল। বিজ্ঞানীদের আশা, নতুন এই ডিএনএ মানচিত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংরক্ষণ সংস্থাগুলোকে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে।
প্যাঙ্গোলিন পাচারের উৎস শনাক্তে নতুন ডিএনএ মানচিত্র বড় অগ্রগতি। আন্তর্জাতিক পাচারচক্র ভাঙতে আশা দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















