কোভিড-১৯ মহামারির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রহস্যগুলোর একটি এখনো অমীমাংসিত। সংক্রমণের তীব্র পর্যায় শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কেন কিছু মানুষের শরীর মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না—এর নির্ভুল উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। কারও শরীরে দেখা দেয় অসহ্য ক্লান্তি, কারও স্মৃতি ও মনোযোগে সমস্যা, কারও শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা কিংবা হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা। আবার কেউ সামান্য হাঁটাচলাতেই এমনভাবে ভেঙে পড়েন যে কয়েক দিন বিছানা ছাড়ার শক্তিও থাকে না।
এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থাকেই সাধারণভাবে বলা হয় দীর্ঘ কোভিড। কিন্তু এই রোগকে ঘিরে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু চিকিৎসার অভাব নয়; সংকটটি আরও গভীরে—রোগটিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, এর কারণ কোথায় খোঁজা হবে এবং রোগীর নিজের অভিজ্ঞতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়েই চিকিৎসাবিজ্ঞান যেন দুই বিপরীত শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
একদিকে রয়েছেন সেই রোগীরা, যারা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের শারীরিক যন্ত্রণা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে রয়েছেন চিকিৎসক ও গবেষকদের একটি অংশ, যারা মনে করেন দীর্ঘ কোভিডের কিছু উপসর্গে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা থাকতে পারে এবং বিশেষ ধরনের মানসিক-শারীরিক পুনর্বাসন হয়তো কিছু রোগীর উপকার করতে পারে।
কিন্তু এই দ্বিতীয় ধারণাটি উচ্চারিত হলেই অনেক ক্ষেত্রে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যেসব রোগীকে ‘সবই মনের ব্যাপার’ বলে অবজ্ঞা করা হয়েছে, তাদের কাছে মানসিক কারণের কথা শোনা অনেক সময় পুরোনো অপমানেরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয়।
ছয় বছর পরও রহস্যের কেন্দ্রে দীর্ঘ কোভিড
দীর্ঘ কোভিডের প্রকোপ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তার মধ্যেও রয়েছে বিস্ময়কর পার্থক্য। কোথাও জনসংখ্যার অল্প একটি অংশ আক্রান্ত বলে দেখা গেছে, আবার কোথাও আক্রান্তের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিভ্রান্তি।
কিছু পর্যালোচনায় শারীরিক ব্যায়াম ও আচরণগত-মানসিক চিকিৎসার মতো পদ্ধতির পক্ষে মাঝারি মাত্রার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অথচ দীর্ঘ কোভিড নিয়ে রোগী ও বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব পদ্ধতি নিয়ে কথা বলার সময় অনেকেই সতর্ক করেছেন, এমনকি শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলার পরামর্শও দিয়েছেন।
ফলে সাধারণ মানুষের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়—কোনটি সত্য?
আরও বড় প্রশ্ন হলো, এত বছর গবেষণা, বিপুল অর্থ ব্যয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও কেন রোগটির নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা তৈরি হয়নি?
দীর্ঘ কোভিডের ক্ষেত্রে এখনো এমন কোনো একক পরীক্ষা নেই, যার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এই ব্যক্তির দীর্ঘ কোভিড আছে, আর ওই ব্যক্তির নেই। রোগটির পেছনে ক্ষুদ্র রক্তজমাট, ভাইরাসের অবশিষ্টাংশ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন, কোষের শক্তি উৎপাদনের ব্যাঘাত কিংবা স্নায়ুতন্ত্রের নানা ধরনের অস্বাভাবিকতার মতো একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।
কিন্তু কোনো একটি ব্যাখ্যাই এখনো সর্বসম্মত উত্তর হয়ে ওঠেনি।
একজন মানুষের শরীর যখন ধীরে ধীরে থেমে যায়
এই অনিশ্চয়তার সবচেয়ে নির্মম দিক বোঝা যায় রোগীদের জীবন থেকে।
অ্যান্ড্রু লারসন নামে এক ব্যক্তি ২০২৩ সালের শেষ দিকে কোভিডে আক্রান্ত হন। এক সপ্তাহ শয্যাশায়ী থাকার পর তিনি ধীরে ধীরে কাজে ফিরেছিলেন। কিন্তু এক মাসের মধ্যে বুঝতে পারেন, শরীর আগের মতো নেই।
একটু হাঁটলেই মাথা ঝাপসা হয়ে যেত। শরীরে নেমে আসত গভীর ক্লান্তি। তারপর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বাড়ির কিছু কাজ করার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। শরীর যেন আর কোনো পরিশ্রম সহ্য করতে পারছিল না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বিছানাবন্দি হয়ে পড়েন।
পরবর্তী মাসগুলোতে একসময় এমন অবস্থা হয় যে তিনি অন্ধকার ঘরে প্রায় নিশ্চল ও নির্বাক পড়ে থাকতেন। খাবার খেতেন বিশেষ ব্যবস্থায়। বিছানা থেকে ওঠা তো দূরের কথা, চিবানো কিংবা কথা বলার মতো সামান্য কাজও তীব্র ব্যথা এবং দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ ডেকে আনত।
অথচ চিকিৎসা পরীক্ষাগুলো বারবার প্রায় স্বাভাবিক ফল দেখাচ্ছিল।
এটাই দীর্ঘ কোভিডের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক বৈপরীত্য—মানুষটি অসুস্থ, তার জীবন ভেঙে পড়ছে, কিন্তু প্রচলিত পরীক্ষার কাগজে সেই বিপর্যয়ের যথেষ্ট ছাপ নেই।

রোগীর শরীরের কথা বনাম পরীক্ষার কাগজ
দীর্ঘ কোভিডে আক্রান্ত অনেকেই অভিযোগ করেন, চিকিৎসকদের কাছ থেকে তারা সন্দেহ, অবিশ্বাস কিংবা অবহেলার মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়েছেন, কেউ শুনেছেন তারা অতিরঞ্জিত করছেন, আবার কেউ এমন কথাও শুনেছেন যে তারা হয়তো অসুস্থতার ভান করছেন।
লারসনের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। অথচ তিনি নিজে চিকিৎসা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তার মতো অনেক রোগীর কাছে এটি শুধু চিকিৎসাগত সমস্যা নয়, আত্মমর্যাদার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ যখন পরীক্ষায় রোগ ধরা পড়ে না, তখন রোগীকে প্রমাণ করতে হয় যে তার কষ্ট সত্যি। আর সেই প্রমাণের লড়াই থেকেই জন্ম নেয় আরেকটি ভয়—যদি চিকিৎসক, বিমা প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় সংস্থা অসুস্থতাকে যথেষ্ট ‘বাস্তব’ বলে না মানে, তাহলে মানুষটি তার প্রয়োজনীয় সহায়তাও হারাতে পারেন।
এখানেই শুরু হয় বিতর্কিত আরেকটি পথ
লারসনের স্ত্রী শেষ পর্যন্ত এমন একজন চিকিৎসকের সন্ধান পান, যিনি দীর্ঘ কোভিডের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে কাজ করছিলেন।
বেকা কেনেডির ধারণা ছিল, কিছু দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় মস্তিষ্কের ‘লড়াই অথবা পালানো’ ধরনের প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে থাকতে পারে। ব্যথা ও ক্লান্তির সংকেত, যা স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে এমন এক চক্র তৈরি করতে পারে, যার ফলে উপসর্গ আরও বাড়তে থাকে।
এই ধারণা অনুযায়ী চিকিৎসার লক্ষ্য শরীরকে অস্বীকার করা নয়; বরং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়াকে ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত করা।
শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, শরীরের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতনতা, আবেগ প্রকাশ, মানসিক আঘাত নিয়ে কাজ করা এবং কল্পনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট শারীরিক কর্মকাণ্ডের অনুশীলন—এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
লারসন প্রথমদিকে এতে বিশ্বাস করেননি। বরং তিনি মনে করেছিলেন, নিজের জীববিজ্ঞান সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান আছে এবং এ ধরনের পদ্ধতি তার ক্ষেত্রে কাজ করার কথা নয়।
কিন্তু কয়েক মাস পর তার অবস্থায় পরিবর্তন দেখা দেয়।
তিনি হাঁটার সাহায্য নিতে শুরু করেন, স্বাভাবিক খাবার খেতে পারেন, দীর্ঘ সময় কথা বলতে পারেন। পরে নিজে গোসল করা এবং দিনে প্রায় এক হাজার পা হাঁটার মতো সক্ষমতাও ফিরে আসে।
তার আরোগ্যের গতি ছিল ধীর, ওঠানামায় ভরা। কিন্তু তার কাছে পরিবর্তনটি ছিল জীবন বদলে দেওয়ার মতো।
তবে একটি ব্যক্তির সুস্থ হওয়া প্রমাণ নয়
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাটি প্রয়োজন।
কোনো একজন রোগী কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে সুস্থ হয়েছেন—এটি সেই পদ্ধতি সবার জন্য কার্যকর, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়।
একইভাবে, কোনো রোগী কোনো পদ্ধতিতে উপকার পাননি বলেও সেটি সবার জন্য অকার্যকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
দীর্ঘ কোভিডের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোগটির সংজ্ঞাই এখনো ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন রোগীর উপসর্গ একে অপরের সঙ্গে এতটাই আলাদা যে একই নামে ভিন্ন ভিন্ন শারীরবৃত্তীয় সমস্যাকে একত্রে রাখা হচ্ছে কি না, সেটিও গবেষকদের কাছে বড় প্রশ্ন।
জাতীয় বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিষয়ক একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি দীর্ঘ কোভিডের যে বিস্তৃত সংজ্ঞা দিয়েছে, সেখানে আগের সংক্রমণ নিশ্চিতভাবে পরীক্ষায় প্রমাণিত হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়। কয়েক মাস ধরে তালিকাভুক্ত একটি উপসর্গ থাকলেও কেউ ওই সংজ্ঞার আওতায় পড়তে পারেন।
রোগীর যন্ত্রণা স্বীকার করার দিক থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু গবেষণার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিস্তৃত সংজ্ঞা নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ একই নামে যদি ভিন্ন ভিন্ন রোগপ্রক্রিয়াকে একত্র করা হয়, তাহলে গবেষণার ফলও অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
রোগীকে বিশ্বাস করা আর রোগীর ব্যাখ্যাকে বিশ্বাস করা এক নয়
এখানেই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে সূক্ষ্ম জায়গাটি রয়েছে।
একজন রোগী যখন বলেন, ‘আমি অসুস্থ’—তাকে বিশ্বাস করা এবং সম্মান করা জরুরি।
কিন্তু তিনি যখন বলেন, ‘আমার অসুস্থতার কারণ এটি’—তখন সেই কারণকে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার প্রয়োজন থেকেই যায়।
দুটি বিষয়কে এক করে ফেললে গবেষণা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দীর্ঘ কোভিডের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে। অনেক রোগী শারীরিক পরিশ্রমের পর কয়েক দিন বা তারও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ অবসাদের কথা জানিয়েছেন। এই অবস্থাকে বলা হয় পরিশ্রম-পরবর্তী অসুস্থতা বা ভেঙে পড়া।
ফলে ব্যায়াম নিয়ে দীর্ঘ কোভিড গবেষণায় ভয় তৈরি হয়েছে।
কিন্তু কিছু নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, রোগীদের নিজেদের বর্ণনা এবং পরীক্ষাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে পাওয়া শারীরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে সব সময় পূর্ণ মিল নেই।
এতে অবশ্যই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে রোগীদের অভিজ্ঞতা মিথ্যা। বরং এর অর্থ হলো—অভিজ্ঞতা, শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন এবং চিকিৎসার ফলাফলকে আরও সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা দরকার।
পুরোনো ক্ষত: দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তির রোগের ইতিহাস
দীর্ঘ কোভিডের বর্তমান বিতর্ক আসলে একেবারে নতুন নয়।
এর সঙ্গে বহু বছরের পুরোনো একটি রোগের ইতিহাস জড়িয়ে আছে—মায়ালজিক এনসেফালোমায়েলাইটিস বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি সিনড্রোম।
এই রোগেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, চিন্তাশক্তির সমস্যা, স্নায়ুতন্ত্রের অস্বাভাবিকতা, ব্যথা এবং সামান্য পরিশ্রমের পর ভয়াবহ অবনতির মতো উপসর্গ দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে এই রোগে আক্রান্ত মানুষদের অনেকে চিকিৎসা ব্যবস্থার কাছ থেকে অবিশ্বাসের অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। তাদের কেউ ‘অলস’, কেউ ‘মানসিকভাবে দুর্বল’, আবার কেউ ‘অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
একসময় এই রোগের চিকিৎসায় মানসিক আচরণগত চিকিৎসা ও ধীরে ধীরে শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পদ্ধতির ওপর ব্যাপক জোর দেওয়া হয়েছিল।
পরে সেই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। একটি বড় গবেষণাকে কেন্দ্র করে রোগী সংগঠন ও গবেষকদের একাংশ প্রশ্ন তোলে, গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আগের সুপারিশ থেকে সরে আসে।
ফলে দীর্ঘ কোভিড যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন নতুন রোগীদের সামনে এই পুরোনো ইতিহাস ইতিমধ্যেই ছিল।
সেই ইতিহাসই নতুন সন্দেহ তৈরি করেছে
দীর্ঘ কোভিডের রোগীদের একটি বড় অংশের কাছে ‘মানসিক’ বা ‘মস্তিষ্কভিত্তিক’ ব্যাখ্যা তাই খুব স্পর্শকাতর।
কারণ তারা আশঙ্কা করেন, এর অর্থ হয়তো আবার তাদের বলা হবে—তোমার শরীরে আসলে কিছু হয়নি, সবই তোমার চিন্তার ফল।
কিন্তু মস্তিষ্কের ভূমিকা স্বীকার করা আর অসুস্থতাকে ‘কল্পিত’ বলা এক বিষয় নয়।
ব্যথা, ক্লান্তি, ভয়, স্মৃতি, ঘুম, ক্ষুধা—মানবদেহের এসব অভিজ্ঞতায় মস্তিষ্কের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মস্তিষ্ক শরীর থেকে সংকেত গ্রহণ করে, আবার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলে।
ফলে ‘শরীর না মন’—এই দ্বৈত বিভাজনটি বাস্তব জীবনের জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে অনেক সময় অতি সরল করে ফেলে।
যারা সুস্থ হয়েছেন, তাদের কথাও কি শোনা হবে?
এই প্রশ্নটিই পুরো বিতর্ককে আরও কঠিন করে তুলেছে।
জর্জিয়া লুপি দীর্ঘ কোভিডের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। একসময় তিনি প্রায় ঘরবন্দি ছিলেন এবং নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করেছিলেন।
পরে তিনি নিজেও উন্নতি অনুভব করেন। বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি চেষ্টা করার পর মস্তিষ্ককেন্দ্রিক একটি পুনর্বাসন পদ্ধতিতে তিনি উল্লেখযোগ্য উপকার পেয়েছেন বলে জানান।
কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে বলার পর তিনি রোগী সম্প্রদায়ের একটি অংশের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।
তার বক্তব্য ছিল, সুস্থ হয়ে ওঠার কথা বলা মানেই দীর্ঘ কোভিডকে ‘মনের রোগ’ বলা নয়। বরং নিজের অভিজ্ঞতাটিও গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য।
এখানেই বিতর্কের এক গভীর বৈপরীত্য সামনে আসে।
রোগীদের বলা হচ্ছে—নিজের শরীরের অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করুন।
কিন্তু কোনো রোগী যখন বলেন, ‘আমি এই পদ্ধতিতে ভালো হয়েছি’, তখন সেই অভিজ্ঞতাকে কি একইভাবে বিশ্বাস করা হবে?
ব্যায়াম নিয়েও প্রশ্নের শেষ নেই
দীর্ঘ কোভিডে শারীরিক ব্যায়াম সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি।
একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন, অতিরিক্ত পরিশ্রম কিছু রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটাতে পারে। তাই রোগীর শারীরিক সক্ষমতা, উপসর্গ এবং সহনশীলতা বিবেচনা না করে ব্যায়াম চাপিয়ে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
অন্যদিকে পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘ সময় কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ড না করলে হৃদ্রোগ, বিপাকীয় সমস্যা, বিষণ্নতা এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই ‘সবার জন্য ব্যায়াম’ যেমন ভুল ধারণা হতে পারে, তেমনি ‘দীর্ঘ কোভিডে ব্যায়াম মানেই বিপজ্জনক’—এমন সার্বজনীন সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন আরও ভালো গবেষণা—যেখানে রোগীদের বিভিন্ন উপগোষ্ঠী আলাদাভাবে বিবেচনা করা হবে।
কিন্তু এখানেও বাধা আছে।
কিছু গবেষক জানিয়েছেন, ব্যায়াম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তারা নৈতিক অনুমোদন পেতে সমস্যায় পড়েছেন। কোথাও গবেষণা বোর্ড আশঙ্কা করেছে, রোগীদের ব্যায়াম করানো তাদের ক্ষতি করতে পারে। ফলে কিছু গবেষণা শুরু হওয়ার আগেই থেমে গেছে।
ভয় যখন বিজ্ঞানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়
দীর্ঘ কোভিড নিয়ে কাজ করা কয়েকজন গবেষক জানিয়েছেন, এই বিষয়ে মানসিক বা আচরণগত কারণ নিয়ে কথা বলাও কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মত দেন। কেউ আবার সামাজিকভাবে আক্রমণ বা হুমকির আশঙ্কায় গবেষণার বিষয় বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকেন।
এমন পরিস্থিতি শুধু গবেষকদের জন্য নয়, রোগীদের জন্যও ক্ষতিকর।
কারণ কোনো একটি সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই সেটিকে বাতিল করা নয়। একইভাবে কোনো সম্ভাব্য চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করা মানেই রোগীদের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা নয়।
বিজ্ঞান এগোয় প্রশ্নের মাধ্যমে—ভয় দিয়ে নয়।
মস্তিষ্কের চিকিৎসা কি সত্যিই কাজ করতে পারে?
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সৎ উত্তর হলো—কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উপকারের সম্ভাবনা আছে কি না, তা নির্ভরযোগ্যভাবে জানার জন্য আরও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।
মস্তিষ্কের পরিবর্তনশীল ক্ষমতা বা স্নায়ুর পুনর্গঠনযোগ্যতা একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণা। কিন্তু এই ধারণা ব্যবহার করে যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ সারিয়ে ফেলা সম্ভব—এমন দাবি এখনো প্রমাণিত নয়।
কিছু ছোট গবেষণা আশাব্যঞ্জক ফল দিয়েছে। কিছু রোগী নাটকীয় উন্নতির কথা জানিয়েছেন। আবার অনেক রোগী এসব পদ্ধতিতে কোনো উপকার পাননি কিংবা উল্টো হতাশ হয়েছেন।
তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের বিকল্প বানানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করাও ঠিক নয়।
প্রয়োজন এমন গবেষণা, যেখানে রোগীদের যথাযথভাবে বাছাই করা হবে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া হবে এবং ফলাফল নিরপেক্ষভাবে পরিমাপ করা হবে।
আসল লড়াই হয়তো শরীর বনাম মন নয়
দীর্ঘ কোভিডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই।
মানবদেহকে শুধু ‘শরীর’ এবং ‘মন’—এই দুটি আলাদা বাক্সে রেখে বোঝা যায় না।
একটি স্ট্রোকের পর মস্তিষ্ক কখনো কখনো আক্রান্ত অঙ্গের ব্যবহারকে কঠিন বলে ‘শিখে’ ফেলতে পারে। পরে পুনর্বাসনের মাধ্যমে সেই শেখা প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন করা সম্ভব হয়। একইভাবে কোনো খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর মানুষের মস্তিষ্ক ভবিষ্যতে সেই খাবারের প্রতি তীব্র বিরাগ তৈরি করতে পারে।
এগুলো কি শুধু মনের ব্যাপার?
না।
আবার এগুলো কি শুধু শরীরের ব্যাপার?
সেটিও নয়।
মস্তিষ্ক ও শরীর পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
তাই দীর্ঘ কোভিডের ভবিষ্যৎ চিকিৎসাও হয়তো একক কোনো ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে থাকবে না। কারও ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারও ক্ষেত্রে স্নায়ুতন্ত্র, কারও ক্ষেত্রে রক্তনালির পরিবর্তন, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গের সঙ্গে মস্তিষ্ক ও শরীরের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
একজনের জন্য কার্যকর চিকিৎসা অন্যজনের জন্য কার্যকর নাও হতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো রোগীকে মানুষ হিসেবে দেখা
দীর্ঘ কোভিডের চিকিৎসায় সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদ হয়তো ভুল চিকিৎসার চেয়েও বড়—রোগীকে বিশ্বাস না করা।
কেউ অসুস্থ হলে তার কষ্টকে স্বীকার করা উচিত। কিন্তু সেই স্বীকৃতি যেন কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে অন্ধভাবে গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা তৈরি না করে।
একজন রোগী বলতে পারেন, ‘আমি অসুস্থ।’
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলতে পারে, ‘আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না কেন।’
এই দুটি বাক্য পরস্পরের বিরোধী নয়।

বরং বিজ্ঞানের সবচেয়ে সৎ অবস্থান হতে পারে—‘আমরা জানি না, তাই আরও ভালোভাবে অনুসন্ধান করতে হবে।’
দীর্ঘ কোভিডের ক্ষেত্রে সেই অনুসন্ধানকে এগিয়ে নিতে দরকার নির্ভরযোগ্য রোগ-সংজ্ঞা, উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি, বিভিন্ন ধরনের রোগীকে আলাদা করে গবেষণা, সম্ভাব্য ওষুধের পরীক্ষা, পুনর্বাসন পদ্ধতির কঠোর মূল্যায়ন এবং রোগীর অভিজ্ঞতার প্রতি সম্মান।
সত্যের দরজা যেন কোনো ভয় বন্ধ করে না দেয়
দীর্ঘ কোভিডে আক্রান্ত মানুষের সামনে ভয় কম নয়।
তারা ভয় পান অলস বলে চিহ্নিত হওয়ার। ভয় পান মানসিকভাবে অসুস্থ বলে উড়িয়ে দেওয়ার। ভয় পান চিকিৎসা সহায়তা হারানোর। ভয় পান বিমা প্রতিষ্ঠান তাদের অসুস্থতা অস্বীকার করবে। কেউ কেউ ভয় পান, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও সন্দেহের চোখে দেখা হবে।
এই ভয় যদি রোগীকে একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পক্ষ নিতে বাধ্য করে, আর গবেষককে অন্য একটি সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে ভয় পাইয়ে দেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানই।
দীর্ঘ কোভিডের রহস্য সমাধানের জন্য তাই হয়তো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কোনো একক অলৌকিক চিকিৎসা নয়—বরং এমন একটি পরিবেশ, যেখানে রোগী তার কষ্টের কথা বলতে পারবেন, গবেষক প্রশ্ন তুলতে পারবেন এবং কোনো পক্ষের ভয় ছাড়াই সব সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি পরীক্ষা করা যাবে।
কারণ শরীর কিংবা মন—কোনোটিকেই বাদ দিয়ে মানুষের অসুস্থতাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না।
আর দীর্ঘ কোভিডের যন্ত্রণাদায়ক সত্য সম্ভবত এটাই—রোগীরা সত্যিই কষ্ট পাচ্ছেন, কিন্তু তাদের কষ্টের সম্পূর্ণ কারণ এবং সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা সম্পর্কে বিজ্ঞান এখনো শেষ কথা বলতে পারেনি।
সেই অজানাকে ঢেকে দেওয়ার জন্য কোনো পক্ষেরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















