এক দশক আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সংগীতজগতে চার তরুণীর আগমন হয়েছিল। হাতে ছিল গান, চোখে ছিল স্বপ্ন আর সামনে ছিল বিশাল এক অনিশ্চিত পথ। কিন্তু জিসু, জেনি, রোজে ও লিসা হয়তো তখনও জানতেন না, তাদের চারজনের সম্মিলিত যাত্রা একদিন শুধু কে-পপের ইতিহাস নয়, বিশ্বসংগীতের গতিপথেও পরিবর্তনের গল্প হয়ে উঠবে।
২০১৬ সালের ৮ আগস্ট ‘হুইসল’ ও ‘বুমবায়াহ’ গান নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ব্ল্যাকপিঙ্ক। সে সময় তাদের পরিচয় ছিল ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টের নতুন নারী দল হিসেবে। এর আগে একই প্রতিষ্ঠান থেকে জনপ্রিয় নারী দল টুয়েনি ওয়ান উঠে এসেছিল। ফলে নতুন দলটির ওপর প্রত্যাশার চাপও ছিল যথেষ্ট।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বোঝা গেল, ব্ল্যাকপিঙ্ক কেবল আরেকটি কে-পপ দল নয়। তারা এমন এক সময় বিশ্বমঞ্চে উঠে আসে, যখন কে-পপ এশিয়ার বাইরে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। আর সেই ঢেউকে বিশ্বসংগীতের মূলধারায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্ল্যাকপিঙ্ক হয়ে ওঠে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
চারজন শিল্পী, এক অভূতপূর্ব যাত্রা
ব্ল্যাকপিঙ্কের সাফল্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তারা বিশ্বকে কে-পপের নারীশিল্পীদের নতুনভাবে দেখতে বাধ্য করেছে।
তাদের সংগীত, পোশাক, নৃত্য, মঞ্চ পরিবেশনা এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হয় এমন একটি স্বতন্ত্র পরিচয়, যা পরে কে-পপের নারী দলগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের নান্দনিকতার জন্ম দেয়।
‘গার্ল ক্রাশ’ নামে পরিচিত সেই শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী ভাবধারা শুধু দক্ষিণ কোরিয়াতেই জনপ্রিয় হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছেও এটি হয়ে ওঠে আকর্ষণের অন্যতম কারণ।

ব্ল্যাকপিঙ্কের গান যেমন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছেছে, তেমনি তাদের ব্যক্তিত্বও পৌঁছেছে। চার সদস্য প্রত্যেকে ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছেন। ফলে দলটির জনপ্রিয়তা কোনো একক সদস্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকেনি।
বিলবোর্ড থেকে বিশ্বমঞ্চ
২০২২ সালে প্রকাশিত ‘বর্ন পিঙ্ক’ অ্যালবাম ব্ল্যাকপিঙ্কের আন্তর্জাতিক সাফল্যের অন্যতম বড় প্রমাণ হয়ে ওঠে। অ্যালবামটি যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড ২০০ এবং যুক্তরাজ্যের অফিসিয়াল অ্যালবাম তালিকা—দুটিতেই শীর্ষস্থান দখল করে।
এটি ছিল ঐতিহাসিক সাফল্য। এর আগে কে-পপের কোনো নারী দল একইভাবে বিশ্বসংগীতের দুই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে এমন অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে একটি ধারণা আরও শক্তিশালী হয়—কে-পপের নারীশিল্পীরা শুধু এশিয়ার বাজারের জন্য নয়, বিশ্বসংগীতের মূলধারার জন্যও বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।
এরপর ২০২৩ সালে আসে আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কোচেল্লা সংগীত উৎসবের প্রধান শিল্পী হিসেবে মঞ্চে ওঠে ব্ল্যাকপিঙ্ক। কে-পপের কোনো দলের জন্য এটি ছিল এক বিশাল মাইলফলক।
শুধু তাই নয়, পরে ইউটিউবে তাদের অনুসারীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। সংখ্যাটি কেবল জনপ্রিয়তার হিসাব নয়; এটি বিশ্বজুড়ে তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাবেরও প্রতিচ্ছবি।
সংগীতের বাইরেও চার তারকার সাম্রাজ্য
ব্ল্যাকপিঙ্কের সাফল্য কখনো শুধু গানেই আটকে থাকেনি।
চার সদস্যই আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন। শ্যানেল, ডিওর, সেলিন ও সেন্ট লরাঁর মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা সংগীতশিল্পী হিসেবে পরিচয়ের বাইরে নতুন এক বিশ্ব তৈরি করেছে।
ফলে ব্ল্যাকপিঙ্কের সদস্যরা একই সঙ্গে গায়িকা, পরিবেশক, ফ্যাশন তারকা ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছেন।
বিশ্বের বড় বড় শহরে কনসার্ট আয়োজনের ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের শক্ত অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশাল দর্শকসমাগম এবং ব্যাপক আয় তাদের কে-পপের নারী দলগুলোর মধ্যে অন্যতম সফল ভ্রমণশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দল থেকে আলাদা, আবার দলের কাছেই
ব্ল্যাকপিঙ্কের দশ বছরের গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ২০২৩ সালের শেষ দিকে। চার সদস্য দল হিসেবে ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টের সঙ্গে চুক্তি রাখলেও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের জন্য আলাদা পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন।
জেনি নিজের প্রতিষ্ঠান অড আতোলে গড়ে তোলেন। লিসা প্রতিষ্ঠা করেন লাউড। জিসু নিজের প্রতিষ্ঠান ব্লিসুর মাধ্যমে এগিয়ে যান। রোজে কাজ শুরু করেন দ্য ব্ল্যাক লেবেলের সঙ্গে।
এই সিদ্ধান্ত তখন অনেকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছিল। কারণ একটি দলের সদস্যরা যখন আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে যান, তখন দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
কিন্তু ব্ল্যাকপিঙ্ক সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে তাদের কাজের মাধ্যমে।
চারজনই একক শিল্পী হিসেবে নিজেদের পরিচয় আরও দৃঢ় করেছেন। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্যক্তিগত সাফল্য দলটির জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেয়নি। বরং প্রত্যেকের নিজস্ব পরিচয় ব্ল্যাকপিঙ্কের সামগ্রিক ব্র্যান্ডকে আরও শক্তিশালী করেছে।
রোজের বিশ্বজয়ী উত্থান
রোজে একক শিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ব্রুনো মার্সের সঙ্গে তার যৌথ গান ‘এপিটি.’ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
গানটির সাফল্য তাকে আন্তর্জাতিক সংগীত অঙ্গনে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে রোজে প্রমাণ করেন, ব্ল্যাকপিঙ্কের পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়েও তিনি নিজের আলাদা সংগীতজগৎ তৈরি করতে সক্ষম।
জেনির নিজস্ব শিল্পীসত্তা
জেনিও নিজের প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক অ্যালবাম ‘রুবি’র মাধ্যমে নিজের শিল্পীসত্তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন।
বিভিন্ন বড় সংগীত উৎসবে প্রধান শিল্পী হিসেবে তার উপস্থিতি এবং টেম ইমপালার সঙ্গে ‘ড্রাকুলা’ গানের সাফল্য দেখিয়েছে, জেনি শুধু ব্ল্যাকপিঙ্কের সদস্য হিসেবে নয়, নিজস্ব পরিচয়ের একজন শক্তিশালী শিল্পী হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছেন।
জিসুর অন্যরকম পথ
জিসুর পথ কিছুটা আলাদা। সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন তিনি।
‘অ্যামোরটেজ’ নামের ছোট অ্যালবামের মাধ্যমে সংগীতে নিজের যাত্রা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অভিনয়েও তিনি নিজের পরিসর বাড়িয়েছেন। ফলে জিসুর পরিচয় এখন কেবল একজন কে-পপ শিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই।
লিসার বহুমাত্রিক পরিচয়
লিসার ক্ষেত্রেও একই চিত্র।
‘অল্টার ইগো’ অ্যালবামের পাশাপাশি অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের সৃজনশীলতার নতুন দিক দেখিয়েছেন। এইচবিওর জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এ তার উপস্থিতি তাকে সংগীতের বাইরের দর্শকদের কাছেও আরও পরিচিত করে।
এর সঙ্গে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশনা যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
চার সদস্যের মধ্যে লিসার যাত্রাই যেন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখায়—একজন কে-পপ শিল্পীর পরিচয় কতটা বহুমাত্রিক হতে পারে।
তিন বছর পর আবার চারজন
ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও আলাদা সৃজনশীল যাত্রার পর যখন চার সদস্য আবার একসঙ্গে ফিরলেন, তখন অনেকেরই প্রশ্ন ছিল—আগের সেই ব্ল্যাকপিঙ্ক কি আর থাকবে?
উত্তর এসেছে তাদের তৃতীয় ছোট অ্যালবাম ‘ডেডলাইন’-এর মাধ্যমে।
তিন বছর পাঁচ মাস পর প্রকাশিত এই দলীয় কাজ প্রমাণ করেছে, আলাদা হয়ে কাজ করা চার শিল্পীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও ব্ল্যাকপিঙ্ক নামটির শক্তি অটুট রয়েছে।
অ্যালবামটি প্রকাশের প্রথম সপ্তাহেই প্রায় ১৭ লাখ কপি বিক্রি করে কে-পপের নারী দলগুলোর মধ্যে নতুন রেকর্ড গড়ে।
প্রধান গান ‘গো’-তে ক্রিস মার্টিন ও সংগীত প্রযোজক সার্কাটের সহযোগিতাও দলটির আন্তর্জাতিক সংগীতভুবনের সঙ্গে সংযোগকে আরও দৃঢ় করেছে। গানটি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংগীত তালিকায় ব্ল্যাকপিঙ্কের ১১তম উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
সামনে কোন পথে ব্ল্যাকপিঙ্ক?
ব্ল্যাকপিঙ্কের প্রথম দশকের গল্প শেষ হলেও আসল প্রশ্ন হয়তো এখন শুরু হচ্ছে।
চারজন সদস্য এখন চারটি আলাদা শিল্পীসত্তা। প্রত্যেকের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, নিজস্ব সংগীতধারা, নিজস্ব পরিকল্পনা এবং নিজস্ব আন্তর্জাতিক পরিচয় রয়েছে।
তারপরও যখন তারা একসঙ্গে দাঁড়ান, তখন চারজন আলাদা শিল্পী আবার একটি নামের অধীনে মিলিত হন—ব্ল্যাকপিঙ্ক।
এটাই হয়তো তাদের আগামী দশকের সবচেয়ে বড় শক্তি।
একসময় একটি দলকে টিকিয়ে রাখতে সদস্যদের সবসময় একসঙ্গে থাকতে হতো। ব্ল্যাকপিঙ্ক দেখিয়েছে, সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাও বদলে যেতে পারে। চারজন শিল্পী নিজেদের আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেও একটি বৃহত্তর পরিচয়ের অংশ হয়ে থাকতে পারেন।

দশ বছর পেরিয়ে নতুন ইতিহাস
দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও ব্ল্যাকপিঙ্কের উপস্থিতি কেবল সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কোরিয়ার জাতীয় জাদুঘরের পণ্য ব্র্যান্ড মিউজের সঙ্গে যৌথভাবে তাদের ঐতিহ্যভিত্তিক সংগ্রহ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এটি যেন তাদের যাত্রার একটি প্রতীকী স্বীকৃতি।
দশ বছর আগে তারা এসেছিল একটি নতুন কে-পপ নারী দল হিসেবে। আজ তারা বিশ্বসংগীত, ফ্যাশন, বিনোদন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক বিস্তৃত পরিসরের অংশ।
ব্ল্যাকপিঙ্কের গল্প তাই শুধু চারজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি একটি সংগীতধারার বিশ্বজয়ের গল্প। এটি দেখায়, ভাষার সীমা পেরিয়ে গান কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এটি দেখায়, একটি দল কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজের পরিচয় বদলে নিয়েও তার মূল শক্তি ধরে রাখতে পারে।
আর আগামী দশক?
সেখানে হয়তো ব্ল্যাকপিঙ্ককে আরও বড় একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—চারটি আলাদা শিল্পীসাম্রাজ্য কতদিন একই নামে, একই স্বপ্নে এবং একই মঞ্চে একত্রিত হতে পারে।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই নিশ্চিত। কে-পপ যখন বিশ্বসংগীতের ভাষা হয়ে উঠছে, সেই ইতিহাসে ব্ল্যাকপিঙ্কের নাম শুধু একটি জনপ্রিয় দলের নাম হিসেবে লেখা থাকবে না।
তাদের নাম থাকবে সেই চার শিল্পীর পাশে, যারা একটি পুরো প্রজন্মকে দেখিয়েছে—বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিতে পরিচয়ের সীমা ভাঙতে হয়, আর সেই সীমা ভাঙার সাহস থাকলে চারজন মানুষও একটি বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















