ভারতের গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচিতে নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রথম মাসেই কাজের সুযোগে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে নতুন কর্মসূচির আওতায় মোট ৭ কোটি ৬৭ লাখ শ্রমদিবস তৈরি হয়েছে, যা গত বছরের একই মাসে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচির আওতায় তৈরি হওয়া ১৫ কোটি ৩৩ লাখ শ্রমদিবসের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে শ্রমদিবস তৈরির হার কমেছে ৪৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একই সময়ে গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচির সুবিধা নেওয়া পরিবারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে মাত্র ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার পরিবার এই কর্মসূচির আওতায় কাজ পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কর্মসংস্থানের সুবিধা পাওয়া পরিবারের সংখ্যা কমেছে ৫১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম কর্মসংস্থান
নতুন কর্মসূচি চালুর প্রথম মাসের এই পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরের তুলনা করলে। গত চার বছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ পরিবার গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচির সুবিধা নিয়েছিল। অথচ চলতি বছরের জুলাইয়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৬৮ লাখে। অর্থাৎ আগের চার বছরের গড়ের ৪০ শতাংশেরও কম পরিবার এবার কর্মসূচির আওতায় এসেছে।
শ্রমদিবস তৈরির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত চার বছরে প্রতি জুলাইয়ে গড়ে প্রায় ২১ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমদিবস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে তৈরি হয়েছে মাত্র ৭ কোটি ৬৭ লাখ শ্রমদিবস, যা ওই গড়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালুর প্রথম মাসেই গ্রামীণ শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকোচনের চিত্র সামনে এসেছে।
পুরনো কর্মসূচি থেকে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা কর্মসূচির পরিবর্তে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে নতুন ‘বিকশিত ভারত—রোজগার ও আজীবিকা নিশ্চয়তা মিশন (গ্রামীণ)’ চালু করেছে ভারত সরকার।
নতুন ব্যবস্থায় একটি গ্রামীণ পরিবারকে বছরে ১২৫ দিনের মজুরি কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আগের কর্মসূচিতে এই নিশ্চয়তা ছিল ১০০ দিনের।
তবে নতুন আইনে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে কাজ বন্ধ রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বীজ বপন ও ফসল কাটার ব্যস্ত সময়ে বছরে মোট ৬০ দিন পর্যন্ত কর্মসূচির কাজ স্থগিত রাখা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষি ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজ্যগুলো এই সময় নির্ধারণ করবে।

অনিয়মিত বর্ষায় প্রশ্ন আরও গুরুতর
জুলাইয়ে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনিয়মিত বর্ষার কারণে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশের ৭৪১টি জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম থেকে গুরুতর কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষিকাজে অনিশ্চয়তা বাড়লে গ্রামীণ দরিদ্র ও অদক্ষ কৃষিশ্রমিকদের জন্য সরকারি কর্মসংস্থান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু সেই সময়েই কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত খরিফ মৌসুমের ফসল চাষের আওতায় এসেছে ৮৯৪ দশমিক ২২ লাখ হেক্টর জমি। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৯২০ দশমিক ৭২ লাখ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চাষের আওতাধীন জমির পরিমাণও ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে।
কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে খরিফ মৌসুমে বীজ বপনের সময় কর্মসূচিতে বিরতি থাকার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, এই বিরতির বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সরকারের দাবি, কর্মসূচি কার্যকরভাবেই চলছে
তবে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পরিসংখ্যানের সঙ্গে সরকারের বক্তব্যের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন কর্মসূচি দেশের সব গ্রামীণ এলাকায় ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হয়েছে এবং পুরনো ব্যবস্থা থেকে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে।
সরকারের দাবি, কর্মসংস্থান চাওয়া গ্রামীণ পরিবারের ৯৮ শতাংশের বেশি পরিবারকে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম মাসে প্রায় ৯ কোটি শ্রমদিবস তৈরি হয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, কর্মসংস্থানের জন্য আবেদন করা ১ কোটি ৩৩ লাখের বেশি গ্রামীণ শ্রমিককে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে ৯ লাখের বেশি সক্রিয় কর্মস্থলে বিভিন্ন কাজ চলছে।
নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য

নতুন কর্মসূচিতে নারীদের অংশগ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্য বলে দাবি করেছে সরকার। এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া মোট শ্রমদিবসের প্রায় ৬৩ শতাংশ নারীদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। আইন অনুযায়ী মোট কর্মসংস্থানের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারীদের জন্য নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সীমার চেয়ে অনেক বেশি অংশগ্রহণ হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি।
কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে। কর্মস্থলে উপস্থিতি নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রকৃত কারণে প্রযুক্তিগতভাবে উপস্থিতি নথিভুক্ত করা সম্ভব না হলে নির্ধারিত ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাজেট বাড়লেও কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে পতন
নতুন কর্মসূচির জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯৫ হাজার ৬৯২ কোটি রুপি বাজেট বরাদ্দের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারের দাবি, এটি এখন পর্যন্ত কোনো গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচির জন্য সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ।
কিন্তু বাজেট বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের প্রকৃত পরিমাণ কতটা বাড়ছে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। কারণ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে শ্রমদিবস এবং কর্মসূচির সুবিধা নেওয়া পরিবারের সংখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই গত কয়েক বছরের তুলনায় বড় পতন হয়েছে।
এর আগে পুরনো গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচির অধীনেও মাসভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরির হার কমছিল। ২০২৫ সালের মার্চে ১৭ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমদিবস তৈরি হয়েছিল, যা ২০২৪ সালের মার্চের ১৭ কোটি ৬৯ লাখের তুলনায় সামান্য কম। এরপরও কর্মসংস্থান তৈরির বার্ষিক পতনের প্রবণতা অব্যাহত ছিল এবং ২০২৬ সালের জুনে পুরনো কর্মসূচির শেষ মাস পর্যন্ত সেই ধারা দেখা যায়।
নতুন কর্মসূচির প্রথম মাসের পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি মাসের হিসাব নয়; বরং ভারতের গ্রামীণ শ্রমবাজারে সরকারি কর্মসংস্থান ব্যবস্থার পরিবর্তন কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে অনিয়মিত বর্ষা, কৃষিকাজের অনিশ্চয়তা এবং গ্রামীণ আয়ের ওপর চাপের মধ্যে সরকারি কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে দরিদ্র ও অদক্ষ শ্রমজীবী পরিবারগুলোর ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















