শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু শব্দকে দেখা যায়, অনুভব করা যায়—এমন এক ভিন্ন জগতের শিল্পভাষা তৈরি করেছেন কোরীয়-আমেরিকান বধির শিল্পী ক্রিস্টিন সান কিম। রাগ, রসবোধ, একাকিত্ব, শৈশবের একঘেয়েমি এবং নিজের পরিচয়ের অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপ দিয়ে তিনি সমকালীন শিল্পের প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্ন করছেন।
জার্মানির বার্লিনে বসবাসকারী এই শিল্পীর নতুন প্রদর্শনী ‘হ্যাভ মেনি ডাম্ব ফাইটস এগেইনস্ট রক’ এখন দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব মডার্ন অ্যান্ড কনটেম্পোরারি আর্টে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রদর্শনীর বিশাল পরিসরে ছড়িয়ে রয়েছে সাদা-কালো রেখার বিস্তার এবং একটি বিশাল বাঁকানো জৈব আলো-নির্গত পর্দা। এসবের মধ্য দিয়ে কিম শব্দ, নীরবতা, দেহ ও যোগাযোগের সম্পর্ককে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
শিল্পের পথে পরিবারই ছিল প্রথম ভিত্তি
কিমের বেড়ে ওঠা কোনো শিল্পমুখর পরিবারে নয়। তাঁর বাবা-মা কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাঁদের দুই কন্যাই বধির হওয়ায় নতুন দেশে গিয়ে তাঁদের ইংরেজির পাশাপাশি আমেরিকান ইশারা ভাষাও শিখতে হয়।
কিমের ভাষায়, তাঁর পরিবার শিল্প নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু বাবা-মায়ের ইশারা ভাষা শেখার সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনকে গভীরভাবে বদলে দেয়।
তাঁর মতে, অধিকাংশ বধির মানুষের মতো তাঁর সঙ্গে বাবা-মায়ের যোগাযোগের দেয়াল তৈরি হয়নি। ইশারা ভাষা শেখার কারণে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। আর সেই সম্পর্কই তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পরবর্তী শিল্পীজীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
কিম মনে করেন, তাঁর বাবা-মা যদি ইশারা ভাষা না শিখতেন, তাহলে সম্ভবত তিনি কখনো শিল্পী হয়ে উঠতেন না। তাঁর বোনও একই ধারণা পোষণ করেন।
শৈশবেই দেখেছিলেন অধিকার আদায়ের পরিবর্তন
ক্যালিফোর্নিয়ার অরেঞ্জ কাউন্টিতে বেড়ে ওঠার সময় কিম যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার বিস্তারের পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন। ১৯৯০ সালে প্রতিবন্ধী আমেরিকানদের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আইন কার্যকর হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর।

সেই সময় প্রবেশাধিকার, সুযোগ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা তাঁর পরিচয়বোধকে প্রভাবিত করে। তবে পরিবারে জাদুঘর বা শিল্প প্রদর্শনীতে নিয়মিত যাওয়ার সংস্কৃতি ছিল না।
তাঁর জীবনে শিল্পের দরজা খুলে দেয় আরও একটি ঘটনা। স্কুলে একদিন একজন বধির শিল্পশিক্ষক এসে শিক্ষার্থীদের কাগজ তৈরির পদ্ধতি দেখিয়েছিলেন। ছোট্ট কিমের কাছে ঘটনাটি ছিল বিস্ময়কর।
তিনি বুঝতে পারেন, শিল্প শুধু দূর থেকে দেখার বিষয় নয়; নিজের হাতে তৈরি করাও শিল্পের অংশ হতে পারে। বহু বছর পরও সেই বধির শিল্পশিক্ষকের স্কুলে আসার ঘটনাটি তাঁর মনে গেঁথে আছে।
নিরাপদ চাকরির কথা ভেবে শিল্প থেকে দূরে ছিলেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কিম শিল্পকে প্রধান বিষয় হিসেবে বেছে নেননি। ভবিষ্যতে চাকরির নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি অন্য বিষয় পড়েছিলেন।
পরে এক সাবেক প্রেমিকের শিল্পী পরিবার তাঁকে জাদুঘর, প্রদর্শনী ও ইউরোপের সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই পরিবার তাঁকে শুধু প্রেমিকের সঙ্গী হিসেবে নয়, নিজেদের পরিবারের একজনের মতো করে শিল্প ও সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
সম্পর্কটি শেষ হয়ে গেলেও সেই পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বজায় থাকে। আর ধীরে ধীরে শিল্পের জগৎ তাঁর নিজের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
রাগী কিশোরী থেকে বিশ্বখ্যাত শিল্পী
আজ কিম আন্তর্জাতিক সমকালীন শিল্পের পরিচিত মুখ। ২০২৫ সালে ব্রিটিশ শিল্প সাময়িকীর প্রভাবশালী শিল্পীদের তালিকায় তিনি ৩৪তম স্থানে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের হুইটনি মিউজিয়াম অব আমেরিকান আর্টে তাঁর বড় আকারের প্রদর্শনী হয়েছে, যা পরে মিনিয়াপোলিসের ওয়াকার আর্ট সেন্টারেও প্রদর্শিত হয়।
টোকিওর মোরি আর্ট মিউজিয়াম, গওয়াংজু বিয়েনালে এবং বার্লিন বিয়েনালেসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পমঞ্চে তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে।
তবে কিম সবসময় এমন প্রাণবন্ত ও রসিক ছিলেন না। নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ছোটবেলায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত রাগী। বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রায়ই তাঁর ঝগড়া হতো। জীবনের কাছ থেকে তিনি আরও বেশি কিছু চেয়েছিলেন।

বধির হিসেবে বড় হতে গিয়ে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। কী করতে পারবেন, কী করতে পারবেন না—এমন অনেক ‘না’ শুনতে হয়েছে। নিজের চাওয়া ও অনুভূতি ঠিকমতো প্রকাশ করতে না পারাও তাঁর ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
রাগকে শক্তিতে বদলে দিয়েছে হাস্যরস
বড় হওয়ার পর কিম সেই রাগকে অন্যভাবে ব্যবহার করতে শিখেছেন। শৈশবে অনেক ‘না’ শোনার পর এখন তিনি বরং সুযোগ দেখলে ‘হ্যাঁ’ বলতে চান।
একই সঙ্গে তিনি শিখেছেন নিজের প্রয়োজনের কথা সরাসরি বলতে। সিউলের জাদুঘরে প্রদর্শনী তৈরির সময় কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটি নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়েছিল। কিন্তু তিনি সেখানে থেমে থাকেননি। আরও দেয়াল ব্যবহার করা যায় কি না, তিনি সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন।
প্রথমে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, এর আগে এমনভাবে কাজ করা হয়নি। কিন্তু কিম প্রশ্ন করায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়।
তাঁর শিল্পে রাগ ও হাস্যরস পাশাপাশি অবস্থান করে। কিমের কাছে হাস্যরস শুধু বিনোদনের উপায় নয়, বরং মানুষের সঙ্গে সংযোগ ধরে রাখার একটি কৌশল।
তিনি জানান, নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করলে অনেক সময় মানুষ দূরে সরে যেতে পারে। একজন বধির ও রাগী নারী হিসেবে তাঁকে বিচার করে মানুষ তাঁর কথা শোনার আগ্রহ হারাতে পারে। তাই হাস্যরস তাঁকে দর্শকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সংযুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে।
শব্দকে শোনার বদলে দেখার চেষ্টা
কিমের শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শব্দের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়া। শব্দ সাধারণত কানে শোনার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু কিম শব্দকে রেখা, গতি, চিহ্ন ও দৃশ্যমান আকারের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন।
কখনো তিনি সংগীতের স্বরলিপিকে টেনে দীর্ঘ রেখায় রূপ দেন। কখনো কমিকসের গতিরেখা ব্যবহার করেন। আবার কখনো এমন দৃশ্যমান শিল্পভাষা তৈরি করেন, যার ভেতর দিয়ে দর্শক নিজেই হাঁটতে পারেন।
ফলে তাঁর শিল্পে শব্দ আর কেবল শ্রুতির বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে চোখে দেখা, শরীরে অনুভব করা এবং কল্পনার মাধ্যমে উপলব্ধি করার বিষয়।
একঘেয়েমিই হয়ে উঠেছিল সৃষ্টির উৎস
কিমের শিল্পভাবনার উৎস সবসময় ব্যস্ততা বা তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ নয়। বরং তাঁর মতে, শৈশবের একঘেয়েমিই তাঁকে কল্পনা করতে শিখিয়েছে।
তখন তাঁর হাতে ইন্টারনেট ছিল না। বই পড়তেও তাঁর খুব একটা ভালো লাগত না। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানেও সবসময় লিখিত সংলাপ থাকত না, ফলে সেগুলো অনুসরণ করা কঠিন ছিল। তাই তিনি অনেক সময় কল্পনার জগতে ডুবে থাকতেন।
সেই দীর্ঘ একঘেয়েমি তাঁর ভেতরে এমন এক কল্পনাশক্তি তৈরি করে, যা পরবর্তীতে শিল্পের ভাষা হয়ে ওঠে।
প্রতিদিনের টাকার নোটেও বধির ইতিহাস
কিমের দৃষ্টি শুধু সমকালীন শিল্পে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বধির মানুষের ইতিহাসের ছোট ছোট, প্রায় অদৃশ্য হয়ে থাকা চিহ্নগুলোকেও সামনে আনতে চান।
সাক্ষাৎকারের সময় তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার ১০ হাজার ওনের একটি নোট দেখিয়ে তাতে থাকা রাজা সেজংয়ের প্রতিকৃতির কথা বলেন। তাঁর দাবি, এই প্রতিকৃতির শিল্পী ছিলেন একজন বধির কোরীয় শিল্পী—কিম কি-চ্যাং।
কিমের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ প্রতিদিন হাতে সেই নোট ধরছেন, অথচ এর সঙ্গে বধির সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে—এ কথা অনেকেই জানেন না।

তাঁর কাছে এটি দৃশ্যমানতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সমাজের একটি অংশ কীভাবে প্রতিদিনের জীবনের মধ্যেই উপস্থিত থাকে, অথচ তার ইতিহাস ও অবদান মানুষের চোখ এড়িয়ে যায়—এই বিষয়টিই তিনি সামনে আনতে চান।
শিল্প দিয়ে সম্ভবনার নতুন পৃথিবী
কিম বিশ্বাস করেন, একটি শিল্পকর্ম একাই হয়তো পৃথিবীকে রাতারাতি বদলে দিতে পারে না। কিন্তু শিল্প মানুষের কল্পনাকে বদলে দিতে পারে। আর মানুষ যদি অন্যরকম একটি পৃথিবী কল্পনা করতে পারে, তাহলে সেই পৃথিবী বাস্তবে তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
তাঁর লক্ষ্য তাই শুধু দর্শকদের চমকে দেওয়া নয়। তিনি চান তাঁর শিল্প এমন মানুষদেরও প্রভাবিত করুক, যাঁরা আইন ও নীতি নির্ধারণ করেন। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য আরও ন্যায়সংগত আইন ও নীতি তৈরির ক্ষেত্রে কল্পনাশক্তি ও সংবেদনশীলতার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সিউলের প্রদর্শনীতে কালো-সাদা রেখা, কম্পমান শব্দের অনুভূতি এবং মাঝখানে থাকা অনড় ‘পাথর’—সবকিছু মিলিয়ে কিম আসলে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন: কে কথা বলার সুযোগ পায়, কার কথা শোনা হয় এবং শব্দের অর্থ কি শুধু কানে শোনা দিয়েই নির্ধারিত হবে?
ক্রিস্টিন সান কিমের শিল্প সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে নীরবতার মধ্য দিয়ে। তিনি দেখিয়ে দেন, শব্দ না শুনেও শব্দকে নতুন করে কল্পনা করা যায়—আর সেই কল্পনা দিয়েই সমাজের প্রচলিত সীমারেখাগুলো নতুনভাবে আঁকা সম্ভব।
ক্রিস্টিন সান কিমের শিল্পজগৎ মূলত রাগ, হাস্যরস, স্মৃতি ও কল্পনার এক অনন্য সংমিশ্রণ। তাঁর জীবনের সীমাবদ্ধতাগুলোই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে তাঁর শিল্পের শক্তি। আর সেই শক্তি দিয়ে তিনি শুধু বধির মানুষের অভিজ্ঞতাকেই সামনে আনছেন না, বরং সবাইকে প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছেন—আমরা যাকে শব্দ বলি, তা কি সত্যিই শুধু শোনার বিষয়?
শোনার বাইরেও শব্দের একটি পৃথিবী আছে—ক্রিস্টিন সান কিম সেই পৃথিবীকেই দৃশ্যমান করে তুলছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















