সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক বিনোদন সেবায় মানুষের আগ্রহ ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মাসে মাসে একাধিক প্ল্যাটফর্মের জন্য টাকা দেওয়ার ক্লান্তি থেকে দর্শকদের অনেকে সরে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো দর্শকদের ধরে রাখতে নতুন কৌশল নিয়েছে। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও ধারাবাহিক দিয়ে বিনামূল্যে ২৪ ঘণ্টা চলা বিশেষ চ্যানেল চালু করছে তারা।
কোরিয়ার বড় স্থানীয় স্ট্রিমিং সেবা ওয়েভ ও টিভিং এখন বিজ্ঞাপননির্ভর বিনামূল্যের সরাসরি সম্প্রচার মডেলের দিকে এগোচ্ছে। দর্শকদের আলাদা করে অর্থ দিয়ে সদস্য হতে না হলেও এসব চ্যানেলে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছে। ফলে দর্শকদের জন্য প্রবেশের বাধা কমছে, একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোও বিজ্ঞাপন থেকে নতুন আয়ের সুযোগ পাচ্ছে।
জনপ্রিয় ধারাবাহিকেই বিনামূল্যের চ্যানেল
ওয়েভ সম্প্রতি বিনামূল্যের অনুষ্ঠান আরও বাড়িয়েছে। প্ল্যাটফর্মটিতে এখন জনপ্রিয় কোরিয়ান ধারাবাহিককে কেন্দ্র করে ২৪ ঘণ্টার চ্যানেল চালু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘গার্ডিয়ান: দ্য লোনলি অ্যান্ড গ্রেট গড’, ‘হোটেল দেল লুনা’ এবং ‘মাই মিস্টার’-এর মতো দর্শকপ্রিয় ধারাবাহিক।
প্ল্যাটফর্মটির সাম্প্রতিক সংস্কারের পর নিবন্ধিত ব্যবহারকারীদের জন্য ১৫২টি সরাসরি সম্প্রচার চ্যানেলের মধ্যে ১৩৩টিই বিনামূল্যে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সুবিধা বিনামূল্যের পাশাপাশি অর্থপ্রদানের সদস্যদের জন্যও উন্মুক্ত।
ওয়েভের লক্ষ্য শুধু দর্শককে বিনোদন দেওয়া নয়, বরং তাদের প্রতিদিনের অভ্যাসের অংশ হয়ে ওঠা। এ জন্য ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠান চালানোর পাশাপাশি দৈনিক উপস্থিতির পুরস্কার এবং শুধু শব্দ শোনার সুবিধার মতো ফিচারও ব্যবহার করছে প্ল্যাটফর্মটি।
ব্যবহারকারীর সময় ধরে রাখাই বড় লক্ষ্য
ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিবেচনায় নেটফ্লিক্স এখনো কোরিয়ার বাজারে এগিয়ে। তবে একজন ব্যবহারকারী মাসে গড়ে কতক্ষণ প্ল্যাটফর্মে থাকছেন, সে হিসাবেও ওয়েভ বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ওয়েভে একজন ব্যবহারকারী মাসে গড়ে ৪৬৪ মিনিট অনুষ্ঠান দেখেছেন। এই হিসাবে নেটফ্লিক্সের ৫৬৪ মিনিটের পরেই রয়েছে ওয়েভ। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর প্ল্যাটফর্মে কাটানো সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে ওয়েভের কৌশল কার্যকর হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টা চলা চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে দর্শকদের কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান খুঁজে বের করে দেখার প্রয়োজন হচ্ছে না। জনপ্রিয় অনুষ্ঠান পরপর চলতে থাকায় অনেকেই তা পেছনে চালু রেখেই অন্য কাজ করছেন। এতে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে দর্শকের দৈনন্দিন যোগাযোগ আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
টিভিংও একই পথে
ওয়েভের মতো টিভিংও কয়েক বছর ধরে বিনামূল্যে বিজ্ঞাপননির্ভর সরাসরি সম্প্রচার চ্যানেল পরিচালনা করছে। ২০২৩ সাল থেকে দর্শকরা বিজ্ঞাপন দেখার বিনিময়ে বিনামূল্যে জনপ্রিয় পুরোনো অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারছেন।
এসব চ্যানেলে ‘ইনফিনিট চ্যালেঞ্জ’, ‘হাই কিক থ্রু দ্য রুফ’ এবং ‘টু ডেজ অ্যান্ড ওয়ান নাইট’-এর মতো পরিচিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। পুরোনো হলেও দর্শকদের কাছে পরিচিত ও জনপ্রিয় এসব অনুষ্ঠানকে নতুন করে ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মগুলো দর্শক ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ওয়েভ ও টিভিংয়ের সম্ভাব্য একীভূত হওয়ার আলোচনা সামনে রেখে দুই প্রতিষ্ঠানের কৌশলও অনেকটা একই দিকে এগোচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থপ্রদানের সদস্যভিত্তিক ভিডিও সেবার পাশাপাশি বিজ্ঞাপননির্ভর বিনামূল্যের চ্যানেল চালানো এখন স্ট্রিমিং শিল্পের স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপে পরিণত হচ্ছে।
পুরোনো কনটেন্ট থেকেই নতুন আয়
দক্ষিণ কোরিয়ার সুংসিন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিম জিয়ংসপের মতে, বিনামূল্যের টেলিভিশনধর্মী সেবা দর্শকদের সদস্যপদ বাতিল ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত পুরোনো অনুষ্ঠান ও ধারাবাহিক থেকেও নতুন করে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়।
তার মতে, ভবিষ্যতে বিনামূল্যের বিজ্ঞাপননির্ভর সরাসরি সম্প্রচার ব্যবস্থা মূল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেই আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির ভাষ্য, অনেক প্ল্যাটফর্ম এখন এমন পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে দর্শক অন্য কাজ করার সময়ও ভিডিও চালু রাখছেন। অনেকটা পেছনে শব্দ চলতে থাকা বিনোদনের মতো এই ব্যবস্থা দর্শকের সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের যোগাযোগ দীর্ঘ করে। আর দর্শক যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকবেন, বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগও তত বাড়বে।
বিনোদনের অভ্যাস বদলে দিচ্ছে ‘বিঞ্জ চ্যানেল’
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর এই পরিবর্তন শুধু ব্যবসায়িক কৌশল নয়, দর্শকের দেখার অভ্যাসেও পরিবর্তন আনছে। আগে দর্শক নিজের পছন্দের অনুষ্ঠান খুঁজে নিয়ে দেখতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মই নির্দিষ্ট ধারায় অনুষ্ঠান সাজিয়ে দিচ্ছে এবং দর্শককে দীর্ঘ সময় সেখানে ধরে রাখছে।
অর্থপ্রদানের সদস্যপদের পাশাপাশি বিনামূল্যের বিজ্ঞাপননির্ভর চ্যানেলের এই সমন্বিত মডেল তাই কোরিয়ার স্ট্রিমিং বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। জনপ্রিয় পুরোনো কনটেন্টকে বারবার নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে দর্শক ধরে রাখা এবং বিজ্ঞাপন আয় বাড়ানো—দুই লক্ষ্যই একসঙ্গে পূরণ করতে চাইছে স্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















