জাপানে বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য ‘বিজনেস ম্যানেজার ভিসা’ নীতিতে বড় ধরনের কড়াকড়ি আরোপের পর দেশটিতে বসবাসরত বহু উদ্যোক্তা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। নতুন নিয়মের কারণে অনেককে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন জাপান ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাস করা ভারতীয়, নেপালি ও দক্ষিণ কোরীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।
নতুন নীতির আওতায় ভিসা পাওয়ার জন্য এখন ন্যূনতম ৩ কোটি ইয়েন মূলধন, অন্তত একজন পূর্ণকালীন কর্মচারী এবং জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় এন-২ স্তর অর্জনের শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। আগে যেখানে মাত্র ৫০ লাখ ইয়েন মূলধনই যথেষ্ট ছিল, সেখানে এই পরিবর্তন আবেদনকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইসঙ্গে ভিসা যাচাই প্রক্রিয়ার সময়ও বেড়ে প্রায় ছয় মাসে পৌঁছেছে।
কঠোরতার কারণ হিসেবে জাপানের ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, কিছু বিদেশি নাগরিক শুধুমাত্র ভিসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কাগুজে কোম্পানি তৈরি করছিলেন। এই অপব্যবহার ঠেকাতেই নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। তবে অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, বাস্তবে এর প্রভাব পড়ছে দীর্ঘদিনের বৈধ ব্যবসায়ীদের ওপর।
ভিসা বাতিলের পর সংকট
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদন বাতিল হলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি ব্যবসায়ীদের মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে জাপান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আইনজীবীরা বলছেন, আগে যেখানে আবেদনকারীরা পুনরায় আবেদন করার জন্য অতিরিক্ত সময় পেতেন, এখন সেই সুযোগ অনেক কমে গেছে। এমনকি শৈশব থেকে জাপানে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিরাও এই কড়াকড়ির মুখে পড়ছেন।
একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, তার এক ক্লায়েন্ট যিনি নির্ভরশীল ভিসায় জাপানে বড় হয়েছেন, বিজনেস ম্যানেজার ভিসার আবেদন বাতিল হওয়ার পর তাকে ৩০ দিনের মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয় বলেও দাবি করছেন তারা।

পরিবার ও ব্যবসায় প্রভাব
এই নীতির প্রভাবে বহু ছোট রেস্তোরাঁ ও দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিংবা মালিকানা বদল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতীয় ও নেপালি রেস্তোরাঁ মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবারে এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে যেখানে সন্তানরা নির্ভরশীল ভিসায় জাপানে থাকতে পারলেও বাবা-মাকে দেশ ছাড়তে হচ্ছে।
ভিসা প্রত্যাখ্যানের পর বিশেষ অনুমতির আবেদন করলে আবেদনকারীকে অবৈধ অবস্থানকারীর ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। আবার আবেদন বাতিল হলে পাঁচ বছরের জন্য পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখিও হতে পারেন তারা।
অনলাইন পিটিশন ও আইনি লড়াই
বিদেশি ব্যবসায়ীদের পক্ষে ইতোমধ্যে একটি অনলাইন পিটিশনে ৬৫ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে। এই উদ্যোগ শুরু হয় এক ভারতীয় রেস্তোরাঁ মালিকের ভিসা আবেদন বাতিল হওয়ার পর। প্রায় ১৮ বছর ব্যবসা চালানোর পর তাকে দোকান বন্ধ করতে হয়েছে।
পিটিশনের আয়োজক ও সমর্থকেরা এখন আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে সম্ভাব্য গণমামলার কথাও ভাবছেন। তবে অনেক ব্যবসায়ী আশঙ্কা করছেন, আইনি লড়াইয়ে গেলে ভবিষ্যতের ভিসা আবেদন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সংসদেও প্রশ্ন
জাপানের পার্লামেন্টেও এই নতুন নীতির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ২ কোটি থেকে ৫ কোটি ইয়েন মূলধনের প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভজনকতার তথ্য বিশ্লেষণ করেই নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাপানের মাত্র ৮ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মূলধন ৩ কোটি ইয়েন বা তার বেশি। এমনকি ২০২৪ সালের শেষে বিজনেস ম্যানেজার ভিসাধারীদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ এই শর্ত পূরণ করতেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, জাপান পশ্চিমা দেশগুলোর মতো বিনিয়োগভিত্তিক ভিসা কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য জাপানে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
জাপানে বিদেশি ব্যবসায়ী ভিসা সংকট
জাপানের কঠোর ভিসা নীতিতে বিপাকে পড়ছেন বিদেশি ব্যবসায়ীরা। নতুন মূলধন ও ভাষা শর্তে বহু ছোট ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















