মিয়ানমারের রাজনৈতিক রূপান্তর মূল্যায়নে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অধিকার সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী জোডি গিন্সবার্গ বলেছেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্রের কথা কল্পনাই করা যায় না।
থাইল্যান্ড সফরকালে নিক্কেই এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মিয়ানমারে বর্তমানে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠতে পারে না।”
সামরিক শাসনের ছায়া আরও ঘন
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারে স্বাধীন সাংবাদিকতা কঠিন হয়ে ওঠে। সামরিকপ্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের অধীনে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যে ছয়টি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনার লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশের ৩৩০টি টাউনশিপের প্রায় ৬০টিতে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। এসব এলাকায় সরকারের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
নির্বাসিত সাংবাদিকদের উদ্বেগ
সিপিজে বলছে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া বহু সাংবাদিক এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত অবস্থায় সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করা সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জোডি গিন্সবার্গ বলেন, মিয়ানমারের ভেতরে কাজ করা সাংবাদিকরা এখনো জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, বাড়ি জব্দ এবং নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে যে কোনো আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সিপিজে।
আসিয়ানে ফিরতে চাইছে মিয়ানমার
মিন অং হ্লাইংয়ের সরকার আবারও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানের মূল পরিসরে ফিরতে আগ্রহী। তবে ২০২১ সালের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে কার্যত দূরে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তথাকথিত নির্বাচনের ভিত্তিতেও নতুন সংসদকে স্বীকৃতি দেয়নি জোটটি।
এই মাসে ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত আসিয়ান সম্মেলনেও মিয়ানমারের কূটনৈতিক সংকট কাটেনি। যদিও থাইল্যান্ডের নেতৃত্বে কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র পুনরায় সম্পৃক্ততার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে জোটের মধ্যে অনীহা স্পষ্ট।
২০১১ সালের অভিজ্ঞতা
নির্বাসিত অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অং জাও বলেন, ২০১১-১২ সালে মিয়ানমারে সামরিক শাসন থেকে রাজনৈতিক উন্মুক্ততার সময় পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তখন নির্বাসিত সাংবাদিকদের দেশে ফিরে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তিনি স্মরণ করেন, সে সময় প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সরকারের মন্ত্রীরাও থাইল্যান্ডে এসে নির্বাসিত সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো ইতিবাচক বার্তা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংবাদিক কারাবন্দি
সিপিজের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিক কারাবন্দির সংখ্যায় মিয়ানমার বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বছরের শেষে দেশটিতে ৩০ জন সাংবাদিক কারাগারে ছিলেন। তালিকায় শীর্ষে রয়েছে চীন, যেখানে বন্দি সাংবাদিকের সংখ্যা ৫০।
অন্যদিকে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে মিয়ানমারের অবস্থান ১৬৬তম। তালিকার নিচের দিকে রয়েছে চীন ও উত্তর কোরিয়া।
প্রতিবেদনগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। ভিয়েতনামে ১৬ জন সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন বলে জানিয়েছে সিপিজে। কম্বোডিয়ায় ছয় সাংবাদিক কারাগারে আছেন, আর লাওসকে দীর্ঘদিন ধরেই “ব্ল্যাক হোল” হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অভাবে।
মিয়ানমারের রাজনৈতিক রূপান্তর নিয়ে আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
মিয়ানমারে গণমাধ্যম স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ, রাজনৈতিক রূপান্তর প্রশ্নের মুখে
মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবর্তন মূল্যায়নে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে মানদণ্ড করার দাবি তুলেছে সিপিজে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















