বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের সংকট এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে চীনের গাড়ি শিল্পে। আগে যেখানে এই সংকট মূলত স্মার্টফোন ও কম্পিউটার খাতে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বৈদ্যুতিক ও স্মার্ট গাড়ি নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের মূল্যযুদ্ধ ও কম মুনাফার মধ্যে থাকা চীনের গাড়ি কোম্পানিগুলো এখন বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপে আরও সংকটে পড়েছে।
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা এক্সপেংয়ের চেয়ারম্যান হে শিয়াওপেং বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন থেকে কোম্পানির যে মুনাফা হওয়ার কথা ছিল, তার বড় অংশই এখন সরবরাহকারীদের বাড়তি খরচে চলে যাচ্ছে। তিনি জানান, বিশেষ করে মেমোরি চিপের দাম না বাড়লে তাদের নতুন জিএক্স মডেলের মুনাফার হার অনেক ভালো হতে পারত।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন শাওমির প্রতিষ্ঠাতা লেই জুন। নতুন ইউ৭ এসইউভি উন্মোচনের সময় তিনি বলেন, স্মার্ট গাড়িতে বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপ ব্যবহৃত হওয়ায় উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কম দাম বা দীর্ঘমেয়াদি সুদমুক্ত অর্থায়ন সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কেন গুরুত্বপূর্ণ মেমোরি চিপ
বর্তমানের সফটওয়্যারনির্ভর স্মার্ট গাড়িতে মেমোরি চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গাড়ির ভয়েস কন্ট্রোল, স্মার্ট ককপিট, সেন্সর ডেটা বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় চালনা ব্যবস্থার মতো প্রযুক্তি এই চিপের ওপর নির্ভরশীল। চীনে স্মার্ট গাড়ির ব্যবহার বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রনের মতো বড় চিপ নির্মাতারা এখন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এইচবিএম ও ডিডিআর৫ চিপ উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে গাড়ি শিল্পে ব্যবহৃত প্রচলিত মেমোরি চিপের সরবরাহ কমে গেছে এবং দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের আগে এই সংকট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম। কারণ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করছে এবং বিশেষায়িত মেমোরি চিপের বড় অংশ কিনে নিচ্ছে।

মূল্য বাড়িয়েও স্বস্তি নেই
বাড়তি খরচ সামাল দিতে কিছু চীনা গাড়ি নির্মাতা ইতোমধ্যে দাম বাড়াতে শুরু করেছে। গত মাসে বিওয়াইডি তাদের মধ্যম মানের সহায়ক ড্রাইভিং প্যাকেজের দাম ২১ শতাংশ বাড়িয়ে ১২ হাজার ইউয়ানে উন্নীত করে। কোম্পানিটি জানায়, বৈশ্বিক মেমোরি হার্ডওয়্যারের দাম বেড়ে যাওয়াই এর কারণ।
এর কয়েক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত গাড়ি নির্মাতা চ্যাংআনও তাদের কিয়ুয়ান কিউ০৭ এসইউভির নির্দিষ্ট সংস্করণের দাম ৩ হাজার ইউয়ান বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি বলেছে, অটোমোটিভ গ্রেড চিপের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
চীনের যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে এপ্রিলে গড় বিক্রয়মূল্য আগের বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৭১ হাজার ইউয়ানে পৌঁছেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচের চাপ সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
শিল্পের ভবিষ্যৎ কোন পথে
চীনের গাড়ি শিল্পে মুনাফা কমে যাওয়ার প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রথম প্রান্তিকে একটি গাড়ি তৈরি করে গড় মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১১ হাজার ইউয়ানে নেমে এসেছে।
বিশ্লেষক ঝ্যাং ই মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে গাড়ি নির্মাতারা বড় ধরনের মূল্যছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবে। তবে বাজারের প্রতিযোগিতা পুরোপুরি থেমে যাবে না। বিশেষ করে নিম্নমূল্যের গাড়ির বাজারে মূল্যযুদ্ধ কিছুটা অব্যাহত থাকবে।
তার মতে, ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা শুধু কম দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং স্মার্ট ড্রাইভিং প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, গাড়ির মান এবং বিক্রয়োত্তর সেবার মতো ক্ষেত্রগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















