বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক সময় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত থেকে নয়, বরং অনিচ্ছাকৃত ফলাফল থেকে আসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক নীতি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। চীনের উত্থান থামানো, উৎপাদনশিল্প আবার আমেরিকায় ফিরিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, বাস্তবে তার ফল উল্টো দিকেই গিয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি এখন দেখা যাচ্ছে এশিয়ায়—বিশেষ করে ভারত ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
দশকের পর দশক ধরে দুই দেশ একে অপরকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেছে। সীমান্ত বিরোধ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের নেতৃত্বের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে দিল্লি ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের ভেতরে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই দীর্ঘস্থায়ী দূরত্বের জায়গায় ধীরে ধীরে একটি বাস্তববাদী পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। আর এর পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্থির ও একতরফা বাণিজ্যনীতি।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া শুল্কযুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর যে আঘাত হেনেছে, তা শুধু চীনকেই চাপে ফেলেনি; বরং মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও আস্থা দুর্বল করেছে। ওয়াশিংটন বহু বছর ধরে যে বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরত, সেই অবস্থান এখন প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক দেশ বুঝতে শুরু করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব আছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কৌশলও নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারত তার দীর্ঘদিনের “চীনকে এড়িয়ে চলা” নীতির কার্যকারিতা নতুন করে বিচার করছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক কার্যত তলানিতে নেমে যায়। সামরিক উত্তেজনা, বিনিয়োগে বাধা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ দুই দেশের দূরত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি ভারতকে এখন আরও বাস্তববাদী করে তুলছে।
ভারত গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছে। কোয়াডে যোগ দেওয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তি—সবকিছুই ছিল চীনের বিকল্প শক্তি কাঠামো তৈরির অংশ। একই সঙ্গে ভারত আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট আরসিইপিতে যোগ দেয়নি, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ থেকেও দূরে থেকেছে। দিল্লির ধারণা ছিল, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো মানে অর্থনৈতিক নির্ভরতা বাড়ানো।

কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেক জটিল। বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে চীনকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি বা সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। ভারত নিজেও এর সুবিধাভোগী হয়েছে। “চায়না প্লাস ওয়ান” কৌশলের ফলে বহু কোম্পানি ভারতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। অ্যাপলের আইফোন উৎপাদনের একটি বড় অংশ ভারতে সরিয়ে নেওয়া তার বড় উদাহরণ। কিন্তু এই কৌশলও শেষ পর্যন্ত চীনের বিকল্প নয়; বরং চীনের পাশাপাশি আরেকটি উৎপাদনকেন্দ্র তৈরির প্রচেষ্টা।
এ কারণেই দিল্লি এখন বুঝতে শুরু করেছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থান অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মতো প্ল্যাটফর্মে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। সেখানে নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্পর্কের মধ্যে এখনও অবিশ্বাস রয়েছে, কিন্তু সেই অবিশ্বাসের মধ্যেও সীমিত সহযোগিতার জায়গা তৈরি হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি ভারত ও চীনে বাস করে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশও এখন এই দুই অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। দুই দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে, ভোক্তা বাজারও বিশাল হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরস্পরকে সম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কৌশল অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পুনর্মিলনের পেছনে কোনো আদর্শিক পরিবর্তন কাজ করছে না। ভারত ও চীন হঠাৎ করে বন্ধু হয়ে যাচ্ছে না। বরং উভয় দেশ বুঝতে পারছে, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় সীমিত সহযোগিতাও কৌশলগতভাবে মূল্যবান। ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে বড় পরিহাস এখানেই—চীনকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তিকে আরও কাছাকাছি ভাবতে বাধ্য করেছে।
এটি হয়তো পূর্ণ আস্থার সম্পর্ক নয়, কিন্তু বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে এর প্রভাব গভীর হতে পারে। কারণ যদি ভারত ও চীন অন্তত অর্থনৈতিক সমন্বয়ের একটি ন্যূনতম কাঠামোও তৈরি করতে পারে, তাহলে তা শুধু এশিয়ার ভূরাজনীতিই বদলাবে না; বরং পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের কৌশলগত হিসাবও নতুন করে লিখতে হবে।
ডেভিড ডডওয়েল 



















