প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র যেন এক ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিম ফ্রন্টে মাইলের পর মাইলজুড়ে খনন করা ট্রেঞ্চ, কাঁটাতারের বেড়া আর অবিরাম গোলাবর্ষণের কারণে যুদ্ধ স্থবির হয়ে পড়ে। হাজার হাজার সেনা প্রাণ হারালেও বড় ধরনের অগ্রগতি হচ্ছিল না। ঠিক এমন সময় যুদ্ধের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে ‘লিটল উইলি’ নামে পরিচিত একটি পরীক্ষামূলক সাঁজোয়া যান।
যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন অস্ত্রের প্রয়োজন
১৯১৫ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বুঝতে পারে, প্রচলিত যুদ্ধকৌশল দিয়ে জার্মান প্রতিরক্ষা ভাঙা সম্ভব নয়। ট্রেঞ্চের মধ্যে আটকে থাকা সৈন্যদের এগিয়ে নেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। মেশিনগানের গুলি আর কামানের আঘাতে খোলা মাঠ পেরোনো মানেই নিশ্চিত মৃত্যু। ঘোড়সওয়ার বাহিনীও কাজ করছিল না। তখনই এমন একটি সাঁজোয়া যান তৈরির চিন্তা শুরু হয়, যা গুলির আঘাত সহ্য করে সামনে এগোতে পারবে এবং কাঁটাতারের বাধা ভেঙে ট্রেঞ্চ পার হতে পারবে।
‘লিটল উইলি’র জন্ম
ব্রিটেনের লিংকন শহরের ফস্টার অ্যান্ড কোম্পানি তৈরি করে ‘লিটল উইলি’। এটি ছিল প্রথম পরীক্ষামূলক ট্যাংক। যদিও এটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। বড় ট্রেঞ্চ পার হতে সমস্যা হতো, যান্ত্রিক দুর্বলতাও ছিল অনেক। তবুও এটি প্রমাণ করে দেয় যে ট্র্যাকচালিত সাঁজোয়া যান আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। সেই সময় এই প্রকল্পের গোপন নাম দেওয়া হয় ‘ট্যাংক’।
এরপর তৈরি হয় আরও উন্নত নকশার মার্ক-ওয়ান ট্যাংক। দীর্ঘ ট্র্যাক ও বিশেষ আকৃতির কারণে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে চলাচলে বেশি সক্ষম ছিল। যদিও এটি ধীরগতির ছিল এবং প্রায়ই বিকল হয়ে যেত, তারপরও যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে শুরু করে এই নতুন অস্ত্র।

সোমের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা
১৯১৬ সালে সোমের যুদ্ধে প্রথমবারের মতো সীমিত সংখ্যক ট্যাংক ব্যবহার করে ব্রিটিশ বাহিনী। মোট ৪৯টি ট্যাংক মোতায়েন করা হলেও অনেকগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর আগেই বিকল হয়ে পড়ে। কিছু কাদায় আটকে যায়, আবার কিছু জার্মান গোলার আঘাতে ধ্বংস হয়। প্রত্যাশামতো সাফল্য না এলেও এই অভিযান ব্রিটিশদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তারা বুঝতে পারে, ট্যাংককে আলাদা নয়, বরং সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
ক্যামব্রাইয়ের যুদ্ধে বড় পরিবর্তন
১৯১৭ সালের ক্যামব্রাই যুদ্ধে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ট্যাংক ব্যবহার করা হয়। প্রায় ৪৭৬টি মার্ক-ফোর ট্যাংক একসঙ্গে আক্রমণে অংশ নেয়। জার্মান সেনারা আগেই ট্রেঞ্চ আরও চওড়া করে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা ট্যাংকের সঙ্গে বড় বড় কাঠের বান্ডিল বহন করে, যা ট্রেঞ্চে ফেলে অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হতো। এরপর ট্যাংকগুলো সহজেই সামনে এগিয়ে যায়।
জার্মান সেনাদের মধ্যে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুলি ছুড়েও তারা এই লোহার দানব থামাতে পারছিল না। দীর্ঘ তিন বছরের রক্তক্ষয়ী স্থবিরতার পর প্রথমবারের মতো বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হয় তুলনামূলক কম প্রাণহানিতে। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি শুধু সামরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
যুদ্ধের ইতিহাসে স্থায়ী প্রভাব
‘লিটল উইলি’ কখনও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি। কিন্তু এর মাধ্যমে যে ধারণার জন্ম হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীতে আধুনিক ট্যাংক প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করে। আজকের যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক যে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়, তার শুরু হয়েছিল সেই ছোট পরীক্ষামূলক যানটির হাত ধরেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















