ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড় করাতে বিশাল সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। ‘রেড হোয়াইট কো-অপারেটিভ’ নামে এই প্রকল্পে সরকার প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। লক্ষ্য, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ৮০ হাজারের বেশি সমবায় গড়ে তুলে কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া।
মধ্য জাভার গেদাওয়াং গ্রামে ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের একটি সমবায় কেন্দ্র চালু হয়েছে। আগে যেখানে ছোটখাটো স্থানীয় খাবার বিক্রি হতো, এখন সেখানে ভর্তুকি মূল্যের চাল, রান্নার তেল ও এলপিজি গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বাজারের তুলনায় এখানে অনেক কম দামে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো এতে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করার পরিকল্পনা
প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর সরকার এই প্রকল্পকে শুধু একটি সমবায় কর্মসূচি নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। সরকারের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো গ্রামের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন সমবায়গুলো সরাসরি উৎপাদক থেকে পণ্য সংগ্রহ করবে, ফলে দাম কমবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
এই সমবায়ে সদস্য হতে নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়। সদস্যরা কম দামে পণ্য, বেশি ভর্তুকি সুবিধা এবং বার্ষিক মুনাফার অংশ পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে সদস্য না হয়েও সাধারণ মানুষ দোকান থেকে কেনাকাটা করতে পারছেন।
মাঠপর্যায়ে বাড়ছে জটিলতা
যদিও প্রকল্পটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বাস্তবায়নে নানা সমস্যা সামনে আসছে। অনেক গ্রামবাসী সদস্য ফি দিতে অনাগ্রহী। কোথাও কোথাও সমবায় কেন্দ্রের অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দুর্গম এলাকা, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কার্যক্রমকে ধীর করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার-সমর্থিত এই সমবায়গুলো কীভাবে ইন্দোমারেত বা আলফামার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত খুচরা বিক্রয় চেইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় নতুন মিনিমার্টের অনুমোদন বন্ধের প্রস্তাব এসেছে। পশ্চিম নুসা তেঙ্গারা অঞ্চলে কয়েকটি আলফামার্ট ও ইন্দোমার্ট শাখা বন্ধও করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা
ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিটাস ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিবিদ মোহামাদ ইখসান বলেছেন, প্রকল্পটির লক্ষ্য ও ব্যয় নিয়ে এখনো স্পষ্টতা নেই। তার মতে, সমবায় গড়তে নেওয়া সরকারি ঋণ শেষ পর্যন্ত গ্রামের মানুষের ওপরই চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি সমবায়ের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন রুপিয়াহ পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে। এই অর্থের বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে। কিন্তু এই ঋণ পরিশোধে গ্রামের সরকারি উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার করা হবে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম জাভার হাম্বালাং গ্রামে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বাজেট গত বছরের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নের কয়েকটি পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে।

কম সদস্য, বেশি অনিশ্চয়তা
গেদাওয়াং গ্রামে ১১ হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র ১৭৬ জন সমবায়ের সদস্য হয়েছেন। হাম্বালাংয়েও একই চিত্র। স্থানীয়দের মতে, দৈনিক আয় কম হওয়ায় সদস্য ফি অনেকের কাছেই বাড়তি চাপ।
এছাড়া অনেকেই আশা করেছিলেন সমবায় থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাবে। কিন্তু ঋণ খেলাপির ঝুঁকির কারণে অনেক সমবায় এখনো ঋণসেবা চালু করেনি। এতে ছোট ব্যবসায়ী ও কৃষকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
সরবরাহব্যবস্থা ও জনবল সংকট
সমবায়গুলোকে সরাসরি উৎপাদকের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ হওয়ায় বিলম্ব তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেক এলাকায় নিয়মিত পণ্য সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, পর্যাপ্ত বেতন ও দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা না থাকায় কিছু সমবায়ে কর্মকর্তারা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। হাম্বালাংয়ের পাঁচ প্রশাসকের মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।
পুরোনো ব্যর্থতার ছায়া
সমালোচকদের অনেকে এই প্রকল্পের সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তো আমলের ‘কোপেরাসি ইউনিট দেশা’ সমবায় ব্যবস্থার মিল খুঁজে পাচ্ছেন। সেই প্রকল্পও অতিরিক্ত সরকারি ভর্তুকি ও দুর্নীতির কারণে টেকেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রকল্পটিও যদি অতিরিক্ত সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ কমে গেলে গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট প্রাবোও অবশ্য দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তার দাবি, নিয়ম ভাঙলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তবুও প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক এখনো কাটেনি।
গ্রামীণ সমবায় প্রকল্প নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় বাড়ছে বিতর্ক, ভর্তুকি ও ঋণনির্ভর ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















