ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদন খাতে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং কাঁচামালের দামের উল্লম্ফনে আসিয়ানের বিভিন্ন দেশে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাড়ছে চাকরি হারানোর ঝুঁকি। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের উৎপাদন খাত এখন বড় চাপের মুখে পড়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে আসিয়ান অঞ্চলের উৎপাদন খাত এখনো ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও সূচকটি গত নয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক পরিসংখ্যান এখনো প্রকৃত সংকটের গভীরতা তুলে ধরতে পারছে না।
মালয়েশিয়ার আমব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফিরদাওস রসলি বলেন, দেশটির রপ্তানি পরিসংখ্যান এখনো শক্তিশালী দেখালেও বাস্তবে অনেক খাত ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। তাঁর ভাষায়, লজিস্টিকস, দ্বিতীয় স্তরের উৎপাদন শিল্প এবং স্থানীয় নির্মাণ খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বড় শিল্প বা প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখলেও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর সংকট গভীর হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় বন্ধ হচ্ছে ছোট কারখানা
মালয়েশিয়ার বৃহত্তম আসবাবপত্র শিল্পকেন্দ্র মুয়ারে ইতোমধ্যে শতাধিক ছোট আসবাব কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প মালিকদের মতে, যুদ্ধের কারণে বাড়তি ব্যয় ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির চাপ একসঙ্গে পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
টিকেএল ফার্নিচারের মালিক জেফরি এং বলেন, অনেক পুরোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে কারণ তারা আর ক্ষতি বহন করতে পারছে না। ফেডারেশন অব মালয়েশিয়ান ম্যানুফ্যাকচারার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ২৮ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে বা ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে।

ফিলিপাইনে বড় চাকরি সংকট
ফিলিপাইনে মার্চ মাসে উৎপাদন খাত থেকে ২ লাখ ১৭ হাজার কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে, যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির উৎপাদন সূচকও সংকোচনের পর্যায়ে চলে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে চাহিদাও কমিয়ে দিচ্ছে।
প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ মিগুয়েল চানকো বলেন, ফিলিপাইনের রপ্তানি খাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক হার্ডওয়্যার শিল্পের সুবিধা তেমন পাচ্ছে না। ফলে দেশটির উৎপাদন খাত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ভিয়েতনামে জুতাশিল্পে বড় ধাক্কা
ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিক্স খাত এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও জুতাশিল্পে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির চামড়া, জুতা ও ব্যাগ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বাজার কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। একই সঙ্গে লজিস্টিক ব্যয় ১৫ শতাংশ এবং তেলনির্ভর কাঁচামালের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান আগেই নির্ধারিত মূল্যে রপ্তানি চুক্তি করায় এখন অতিরিক্ত ব্যয় নিজেরাই বহন করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে লাভ কমে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সরবরাহ সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা
থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সমুদ্রপথে কাঁচামাল না পেয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিমানপথে পণ্য আনছে, ফলে ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কাছাকাছি অঞ্চল থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের পথ খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কাঁচামাল সংকট আরও তীব্র হবে। বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের মজুত সক্ষমতা মাত্র তিন থেকে চার মাসের জন্য যথেষ্ট। ফলে সরবরাহব্যবস্থায় নতুন ধাক্কা এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আসিয়ানের উৎপাদন খাতে বাড়ছে চাপ, বন্ধ হচ্ছে ছোট কারখানা ও ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















