বিশ্বজুড়ে আবারও “সুপার এল নিনো” নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। আবহাওয়াবিদদের বিভিন্ন মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা এ বছর অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খরা, দাবানল, বন্যা, চরম তাপপ্রবাহ এবং কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা। কিন্তু জলবায়ু নিয়ে জনআলোচনার একটি বড় সমস্যা হলো—সম্ভাবনাকে প্রায়ই নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে এল নিনোর মতো জটিল বৈশ্বিক প্রক্রিয়া এত সরল নয়।
আজকের পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু আতঙ্ক ছড়ানোর মতো নয়। বরং এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন অনিশ্চয়তাকে বুঝে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের নিচে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ উষ্ণ জল জমে আছে। সাধারণত এ ধরনের তাপ সঞ্চয় এল নিনোর সম্ভাবনা বাড়ায়। বছরের শুরুতে বায়ুপ্রবাহের অস্বাভাবিক পরিবর্তন সমুদ্রের গভীরে এক ধরনের শক্তির তরঙ্গ তৈরি করেছে, যা পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে গিয়ে পানির তাপমাত্রা আরও বাড়িয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে ইতোমধ্যে তার প্রভাবও দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে: এই প্রাথমিক উষ্ণতা কি পূর্ণাঙ্গ এল নিনোতে রূপ নেবে?
জলবায়ু ব্যবস্থায় শুধু সমুদ্রের উষ্ণতা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের প্রতিক্রিয়াও দরকার। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্যিক বায়ু দুর্বল হয়ে গেলে সমুদ্রের উষ্ণ পানি আরও পূর্বদিকে সরে আসে এবং একটি আত্মশক্তিশালী চক্র তৈরি হয়। এল নিনো শক্তিশালী হতে হলে এই প্রতিক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে ঘটতে হয়। এখন পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি।
এ কারণেই বসন্তকাল এল নিনো পূর্বাভাসের সবচেয়ে অনিশ্চিত সময়। ইতিহাস দেখায়, বছরের মাঝামাঝি সময়ে অনেক শক্তিশালী সংকেত শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়েছে। ২০১৪ এবং ২০১৭ সালেও আবহাওয়া মডেলগুলো বড় ধরনের এল নিনোর পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু বায়ুপ্রবাহ প্রত্যাশিতভাবে আচরণ না করায় সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি।
সমস্যা হলো, আধুনিক কম্পিউটার মডেল কখনও কখনও সমুদ্রের নিচের উষ্ণতাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়। ফলে তারা এমন এক প্রতিক্রিয়া চক্র অনুমান করে, যা বাস্তবে তৈরি নাও হতে পারে। এ কারণে অনেক পূর্বাভাস বাস্তবতার তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী কিংবা ভীতিকর শোনায়।
তারপরও ঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে তার প্রভাব স্থানভেদে ভয়াবহ হতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা, ইন্দোনেশিয়ায় দাবানল, অ্যামাজনে খরা এবং বিশ্বের নানা অঞ্চলে খাদ্য ও পানির চাপ বেড়ে যেতে পারে। ভারতীয় মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হলে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধাক্কা খেতে পারে। এমনকি বৈশ্বিক তাপমাত্রাও সাময়িকভাবে আরও বেড়ে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ভুল হবে “নিশ্চিত প্রমাণ” পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কখনও শতভাগ নিশ্চিত তথ্যের ওপর দাঁড়ায় না। বরং সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলের কৃষি, পানি সরবরাহ বা জনস্বাস্থ্য মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
তবে প্রস্তুতি আর আতঙ্ক এক জিনিস নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু সংবাদ উপস্থাপনায় প্রায়ই এমন ধারণা তৈরি হয় যেন একটি “সুপার এল নিনো” মানেই অবশ্যম্ভাবী বৈশ্বিক বিপর্যয়। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস মানুষকে হয় অকারণ ভীত করে তোলে, নয়তো ভবিষ্যতে বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তার ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়।
জলবায়ুবিজ্ঞান মূলত সম্ভাবনার বিজ্ঞান। এখানে নিশ্চিততা নয়, বরং অনিশ্চয়তার সীমা বোঝাটাই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, প্রশান্ত মহাসাগর এল নিনোর জন্য অনুকূল অবস্থায় আছে। কিন্তু এখনও খেলা পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। আগামী কয়েক সপ্তাহে বায়ুপ্রবাহ কীভাবে আচরণ করে, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।
তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো—অস্বীকার নয়, আবার অতিরঞ্জিত আতঙ্কও নয়। বরং বিজ্ঞানসম্মত সতর্কতা, বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এটাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক দক্ষতা।
পেদ্রো ডিনেজিও 



















