দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী অবস্থানের মধ্যে ভারতের তৈরি সুপারসনিক ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র কিনতে যাচ্ছে ভিয়েতনাম। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে দুই দেশের আলোচনা এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
সম্প্রতি ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লামের ভারত সফরের সময় নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে, ব্রাহ্মোস বিক্রি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তখন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বিষয়টি নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আরও কয়েকটি ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ব্রাহ্মোসকে বিশ্বের দ্রুততম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভারতীয় ব্রহ্মপুত্র ও রাশিয়ার মস্কভা নদীর নাম মিলিয়ে এর নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মোস অ্যারোস্পেস এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও বাজারজাত করছে।
আসিয়ান অঞ্চলে ভারতের প্রতিরক্ষা প্রভাব বাড়ছে
এর আগে ২০২২ সালে ফিলিপাইনের সঙ্গে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চুক্তি করে ভারত। ২০২৪ সালে দেশটি প্রথম চালান গ্রহণ করে। এরপর ইন্দোনেশিয়াও ব্রাহ্মোস কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বলে জানায় দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্ভাব্য এই চুক্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের প্রতিরক্ষা প্রভাব আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে চীনের বিরুদ্ধে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতেও সহায়ক হবে হ্যানয়ের জন্য।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য
ব্রাহ্মোসে রয়েছে স্টেলথ প্রযুক্তি ও উন্নত গাইডেন্স সিস্টেম। এটি আকাশ, স্থল, সমুদ্র ও পানির নিচ থেকেও নিক্ষেপ করা যায়। ক্ষেপণাস্ত্রটি ২০০ থেকে ৩০০ কেজি ওজনের প্রচলিত ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এবং এর পাল্লা প্রায় ২৯০ কিলোমিটার। ঘণ্টায় প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন বলে দাবি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের।
মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিয়েতনামের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিটির মূল্য হতে পারে প্রায় ৬২ কোটি ডলার। যদিও দুই দেশের মধ্যে এখনও মূল্য নিয়ে আলোচনা চলছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, “চুক্তি এখন প্রায় স্বাক্ষরের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।”
চীনের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্ক হ্যানয়
চীন ও ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলসহ কিছু কৌশলগত ইস্যুতে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে।
তো লামের ভারত সফরের পর ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংও ভিয়েতনাম সফর করেন। সেখানে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রশিক্ষণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেক দেশের মধ্যে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাহুল কে ভোঁসলে বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যাই থাকুক, ভিয়েতনাম নিজেদের কৌশলগত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পথ থেকে সরে আসবে না। তবে ব্রাহ্মোস কেনার ফলে বেইজিং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিও হ্যানয়ের বড় বিবেচনার বিষয়।
ভারতের জন্যও এটি বড় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সাফল্য হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ব্রাহ্মোসের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















