দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সহজ, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তথ্য বিনিময়, সেবা রেফারেল, পর্যবেক্ষণ ও যৌথ বাস্তবায়নে সমন্বয় জোরদার না হলে আইনগত সহায়তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘আইনগত সহায়তায় সমন্বিত উদ্যোগ: দায়িত্ব ও বাস্তবায়ন কৌশল’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব কথা উঠে আসে। বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর এবং ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
মামলা নিষ্পত্তিতে জোর
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আপসযোগ্য মামলার ৮০ শতাংশ এক দিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। বাকি ২০ শতাংশ মামলা দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আগামী তিন মাসে যদি ৫০ হাজার মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে বিচার ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। দুই বছরের মধ্যেই পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, মামলা হওয়ার আগে ও পরে মধ্যস্থতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কোন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে এবং কীভাবে তা সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে সুপারিশ পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি। প্রয়োজন হলে আইন সংশোধনের বিষয়ও সরকার বিবেচনা করবে বলে জানান আইনমন্ত্রী।
পাঠ্যক্রমে আইনগত সচেতনতার আহ্বান
আইনগত সহায়তা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তুলতে বিষয়টি শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করারও আহ্বান জানান মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি জানান।
নারী আসনের সংসদ সদস্য জেবা আমেনা খান নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় ক্যাম্পেইন ও সামাজিক উদ্যোগ বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
সমন্বিত ডেটাবেজ ও রেফারেল ব্যবস্থার গুরুত্ব
আইন ও বিচার বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. খালেদ উল কায়েস বলেন, কার্যকর তদারকি ও সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা এবং সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, আইনগত সহায়তা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ আবাসন, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সহায়তা সম্প্রসারণের আলোচনা
সভায় নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শ্রমজীবী মানুষ, হিজড়া জনগোষ্ঠী, কারাবন্দি, প্রবাসী পরিবার, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষ এবং দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য আইনগত সহায়তা সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া ডিজিটাল আইনগত সহায়তা, অনলাইন বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রি-কেস মেডিয়েশন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়েও মতবিনিময় করা হয়।
ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আইনগত সহায়তা আইনের মূল লক্ষ্য। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই মতবিনিময় সভার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে অংশীদারত্ব আরও জোরদার হবে এবং ন্যায়বিচারভিত্তিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে একটি টেকসই কাঠামো তৈরি হবে।
আইনগত সহায়তায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়
আইনগত সহায়তা কার্যক্রম জোরদারে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আইনগত সহায়তা আরও কার্যকর করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিচারাধীন মামলা কমাতে মধ্যস্থতা ও আপস নিষ্পত্তির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















