ক্যানসারের খবর মানুষকে শুধু অসুস্থ করে না, তাকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। চিকিৎসা শুরুর আগেই সে প্রবেশ করে এক অদৃশ্য মানসিক গোলকধাঁধায়, যেখানে প্রতিটি সংখ্যা, প্রতিটি পরিসংখ্যান, প্রতিটি চিকিৎসা-রিপোর্ট হঠাৎ করে জীবনের চূড়ান্ত ভবিষ্যদ্বাণী হয়ে ওঠে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের রোগ সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তথ্য দিয়েছে, কিন্তু সেই তথ্যের প্রাচুর্য কখনও কখনও মানুষকে মুক্ত করার বদলে আরও গভীর ভয়ের মধ্যে ঠেলে দেয়। তখন মানুষ চিকিৎসা নয়, নিয়ন্ত্রণ খোঁজে; বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা খোঁজে সংখ্যার ভেতরে।
একজন মানুষ যখন জানতে পারেন যে তাঁর শরীরে মরণঘাতী রোগ বাসা বেঁধেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি উত্তর খুঁজতে চান। কিন্তু সেই উত্তর যদি কেবল পরিসংখ্যানের ভাষায় আসে, তবে তা একসময় জীবনের সব অনুভূতিকে গ্রাস করে ফেলে। কোন ধরনের টিউমারে মৃত্যুহার বেশি, কোন পর্যায়ে বাঁচার সম্ভাবনা কত শতাংশ, অন্য রোগীর কী হয়েছিল—এসব তথ্য ধীরে ধীরে বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। মানুষ তখন আর নিজেকে একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখে না; দেখে একটি সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে। যেন সে কোনো পরীক্ষাগারের নমুনা, যার ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারিত।
সমস্যা হলো, সংখ্যা কখনও মানুষের ভয়কে তৃপ্ত করতে পারে না। কারণ ভয় মূলত তথ্যের অভাব থেকে জন্ম নেয় না; জন্ম নেয় অনিশ্চয়তা থেকে। আর অনিশ্চয়তা এমন এক জিনিস, যা শত শত গবেষণা, চিকিৎসা-প্রতিবেদন কিংবা রোগীর অভিজ্ঞতাও পুরোপুরি দূর করতে পারে না। ফলে মানুষ আরও গভীরে ডুবে যায়। সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত রোগীদের খোঁজে, পুরোনো পোস্ট ঘাঁটে, কারা বেঁচে আছে আর কারা নেই তা জানার চেষ্টা করে। এই অনুসন্ধান ধীরে ধীরে এক ধরনের মানসিক আসক্তিতে পরিণত হয়। কারণ তখন সে আসলে তথ্য খুঁজছে না; নিজের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো গোপন সংকেত খুঁজছে।

এই মানসিক অবস্থার মধ্যে একটি নিষ্ঠুর তুলনাবোধও জন্ম নেয়। অন্য কারও রোগ যদি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তবে তাকে দেখে সহানুভূতির বদলে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। কারণ মৃত্যুভয়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো মানুষ নিজের যন্ত্রণাকে একমাত্র বাস্তব যন্ত্রণা বলে ভাবতে শুরু করে। তখন অন্যের অভিজ্ঞতা তুচ্ছ মনে হয়। রোগ যেন কেবল শারীরিক দুর্বলতা নয়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকেও সংকীর্ণ করে ফেলে।
আসলে আধুনিক সমাজ মানুষকে এক অদ্ভুত দ্বৈত বিশ্বাসের মধ্যে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে তাকে শেখানো হয়, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই। অন্যদিকে তাকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে জীবন শেষ পর্যন্ত ভাগ্য, জিনগত বৈশিষ্ট্য কিংবা নিছক দুর্ঘটনার কাছে অসহায়। ফলে মানুষ একই সঙ্গে সর্বশক্তিমান হওয়ার ভান করে এবং গভীরভাবে আতঙ্কিত থাকে। ক্যানসারের মতো রোগ সেই আত্মপ্রতারণাকে নির্মমভাবে উন্মোচন করে দেয়।
এই জায়গায় এসে বিশ্বাসের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বাস মানে কষ্ট অস্বীকার করা নয়। বিশ্বাস মানে এই নয় যে মানুষ আর ভয় পাবে না, কাঁদবে না, কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কায় কেঁপে উঠবে না। বরং বিশ্বাসের আসল শক্তি হলো—এটি মানুষকে নিয়ন্ত্রণের মায়া থেকে মুক্তি দেয়। মানুষ বুঝতে শেখে যে জীবন কেবল সম্ভাবনার খেলা নয়, আর তার অস্তিত্ব কোনো অন্ধ ভাগ্যের হাতে নিক্ষিপ্ত নয়।
অনেক সময় একটি গান, একটি প্রার্থনা কিংবা একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধিই মানুষের চিন্তার ভিত নেড়ে দেয়। তখন সে উপলব্ধি করে, পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনা তার বোধগম্যের ভেতরে না এলেও তা অর্থহীন নয়। এই উপলব্ধি ভয়কে পুরোপুরি মুছে দেয় না, কিন্তু ভয়কে একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয় না। চিকিৎসা তখনও কষ্টকর থাকে, রিপোর্ট তখনও উদ্বেগ তৈরি করে, ভবিষ্যৎ তখনও অনিশ্চিত থাকে। কিন্তু মানুষ আর নিজেকে একা মনে করে না।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো, মানুষ তথ্যের ওপর আস্থা রাখে, কিন্তু অর্থের ওপর নয়। সে জানে মৃত্যুহার কত, কিন্তু জানে না জীবনের মূল্য কী। সে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিস্মিত, কিন্তু মানবিক স্থিতির উৎস কোথায়—সেই প্রশ্নে বিভ্রান্ত। ফলে সংকটের মুহূর্তে তার ভরসা হয়ে ওঠে পরিসংখ্যান, অথচ পরিসংখ্যান কখনও সান্ত্বনা দিতে পারে না।
কঠিন অসুস্থতা মানুষকে প্রায়ই এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা সুস্থ অবস্থায় সে ভুলে থাকতে চায়: মানুষের জীবন পুরোপুরি তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নয়। এই সত্য ভয়ঙ্করও হতে পারে, আবার মুক্তিদায়কও হতে পারে। কারণ যদি সবকিছুই কেবল সম্ভাবনার নিষ্ঠুর খেলায় নির্ধারিত না হয়, তবে জীবনের ভেতরে এখনও অর্থ, সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং আস্থার জায়গা রয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত মানুষ কেবল বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চায় না। সে চায় তার জীবন অর্থহীন নয়—এই বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই হয়তো তাকে সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও টিকে থাকার শক্তি দেয়।
মেগান বাশাম 



















