দেশের মন্থর হয়ে পড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং বেসরকারি খাতকে নতুন গতি দিতে ২০২৬ সালের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শনিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার, রপ্তানি বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতির ধীরগতির প্রেক্ষাপট
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর বলেন, গত তিন বছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। একসময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও তা কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বড় ধরনের চাপে রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থপাচার এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়াও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
উচ্চ সুদের হার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে বলেও উল্লেখ করেন গভর্নর। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতেই বিশেষ এই প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
কীভাবে গঠিত হচ্ছে তহবিল
৬০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল দুটি অংশে গঠিত হবে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি আমানত থেকে। এ অর্থের মেয়াদ হবে তিন বছর বা তার বেশি এবং সুদের হার ধরা হয়েছে ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে, যা সরকারি গ্যারান্টির আওতায় থাকবে।
ঋণের সুদে বড় ভর্তুকি
প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ১০ থেকে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করবে। তবে উদ্যোক্তাদের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ ভর্তুকি দেবে। ফলে উদ্যোক্তারা কার্যত মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন।

কোন খাতে কত বরাদ্দ
সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে বন্ধ কারখানা চালু, উৎপাদন পুনরায় শুরু এবং রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রমে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৯ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ও মাইক্রো শিল্প খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এ খাত থেকে পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এছাড়া উত্তরবঙ্গের কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণেও আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বিশেষ খাতে আলাদা সহায়তা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নের অংশ থেকে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। রপ্তানি খাতের প্রি-শিপমেন্ট ঋণের জন্যও থাকছে ৫ হাজার কোটি টাকা।
চামড়া, জুতা, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে যুব ও প্রবাসী কর্মসংস্থান খাতে এক হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি ও স্টার্টআপ খাতের জন্যও ৫০০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, হাবিবুর রহমান ও ড. মো. কবির আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে, যার লক্ষ্য আড়াই মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















