ঈদকে ঘিরে বাড়ি ফেরার আনন্দে মেতে ওঠার কথা ছিল। নতুন কাপড়, পরিবারকে ঘিরে উৎসবের প্রস্তুতি আর দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা—সবকিছুই অপেক্ষা করছিল নওগাঁর মান্দা উপজেলার বর্ষা ইউনিয়নের কয়েকটি পরিবারের জন্য। কিন্তু সেই আনন্দের যাত্রাই শেষ হলো মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়।
টাঙ্গাইলে যমুনা সেতুর পূর্ব পাশে সোমবার ভোরে রডবোঝাই একটি ট্রাক দুর্ঘটনায় পড়ে উল্টে গেলে প্রাণ হারান ১৫ জন। তাদের মধ্যে নওগাঁর ১০ জন, যার মধ্যে নয়জনই মান্দা উপজেলার একই ইউনিয়নের বাসিন্দা।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নোয়াখালী থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। সেখানে তারা হকারি, পুরোনো মোবাইল ফোন, প্লাস্টিকের খেলনা, ভাঙারি ও মানুষের চুল কেনাবেচার কাজ করতেন। ঈদ উপলক্ষে বাসভাড়া হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় তারা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও কম খরচের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
ভাড়া বাঁচাতে মৃত্যুর পথে
স্থানীয়দের দাবি, ঈদের আগে বাসভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের জন্য এই অতিরিক্ত খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফলে অনেকের মতো তারাও পণ্যবোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা।
দুর্ঘটনায় নিহত মান্দা উপজেলার বাসিন্দারা হলেন—রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের সুলতান হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ তারেক, আবদুর বারেকের ছেলে আবদুর রশিদ, আবদুর রহিমের ছেলে মোহাম্মদ বাদশাহ, একাব্বর হোসেনের ছেলে সোহাগ হোসেন, শহিদুলের ছেলে মোহাম্মদ রবিউল, মোহাম্মদ সাকিমের ছেলে মোহাম্মদ সাগর, মুর্শিদপুর গ্রামের জাফর আলীর ছেলে মঈনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের আবদুর রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ মঈনুল ও মোহাম্মদ গিয়াস।
এ ছাড়া নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা শরিফুলও নিহতদের একজন।

স্বজনদের আহাজারিতে ভারী গ্রাম
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ হোসেন জানান, নওগাঁর উত্তর নজিরপুর কলোনির শতাধিক মানুষ সারা বছর নোয়াখালীতে বিভিন্ন পেশায় কাজ করেন। ঈদের সময় অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে অনেকেই ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরেন।
নিহত তারেকের বাবা সুলতান হোসেন বলেন, বাসভাড়া বেশি হওয়ায় তারা ফেনী থেকে ট্রাকে রওনা দিয়েছিল। সবাই একসঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি ফিরছিল। কেউ কল্পনাও করেনি এটাই তাদের শেষ যাত্রা হবে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় নিহত বাদশাহ মিয়ার বাড়িতে। তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন ছোট মেয়ে রাহি মনিকে বুকে জড়িয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছিল। তিনি মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদি কেনার কথা বলেছিলেন। রোববার রাত ১০টার দিকে শেষবার কথা হয়। সকালে আসে মৃত্যুর খবর।
প্রশাসনের তৎপরতা
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আখতার জাহান শাথী জানিয়েছেন, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হকের সমন্বয়ে মরদেহগুলো দ্রুত বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, নিহতদের দাফন সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
ঈদযাত্রায় বাড়তি ভাড়া এড়িয়ে স্বজনদের কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই পথই কেড়ে নিল একের পর এক তরুণ প্রাণ, শোকের ছায়ায় ঢেকে গেল পুরো জনপদ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















