মৌলভীবাজারের গ্রামীণ জনপদে এবার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন সংগ্রাহক, এতিমখানা ও সাধারণ মানুষ। অন্যান্য বছরের মতো ঘরে ঘরে গিয়ে চামড়া সংগ্রহে শিক্ষার্থীদের তৎপরতা দেখা যায়নি। ফলে বিকেল গড়িয়ে রাত পর্যন্ত বহু মানুষ চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত কেউ চামড়া মাটিতে পুঁতে রেখেছেন, আবার কেউ নদী বা জলাশয়ে ভাসিয়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
চামড়া বিক্রি না হওয়ায় হতাশা
সদর উপজেলার আমতৈল গ্রামের নওয়াব আলী জানান, তিনি কিছু চামড়া কিনেছিলেন এবং আরও কয়েকটি দান হিসেবে পেয়েছিলেন। সেগুলো বিক্রির জন্য শহরের বাস টার্মিনালে নিয়ে গেলেও কোনো ক্রেতা দাম দিতে রাজি হয়নি। এতে যাতায়াত খরচসহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি। বিক্রি না হওয়া চামড়া কোথায় ফেলবেন, সেই চিন্তায়ও ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
শুক্রবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলার অন্যতম বড় চামড়ার বাজার বালিকান্দিসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। চামড়া হাতে নিয়ে অনেকেই ক্রেতার অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।
ঐতিহ্যের বাজারে মন্দার ছায়া
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বালিকান্দিতে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চামড়ার হাট বসছে। একসময় এই এলাকার বহু পরিবার বংশপরম্পরায় কাঁচা চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সৈয়দ মুজাহিদ আলী বলেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে চামড়ার বাজারে ধারাবাহিক মন্দা চলছে। অনেক ব্যবসায়ী পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। ট্যানারি মালিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকায় অনেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লবণের সংকটে নতুন দুশ্চিন্তা
চামড়া ব্যবসায়ী সুলেমান মিয়া জানান, রাত পর্যন্ত তিনি পাঁচ শতাধিক চামড়া কিনেছেন। তবে প্রয়োজনীয় লবণের অভাবে সব চামড়া সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব না হলে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বালিকান্দি বাজার চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শওকত আলী মেম্বার বলেন, গত বছরের বকেয়া অর্থ এখনও পরিশোধ হয়নি। এ অবস্থায় নতুন করে চামড়া সংগ্রহ করলেও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, কয়েকশ মণ লবণ প্রয়োজন হলেও মজুত রয়েছে তার অর্ধেকেরও কম। ফলে দুর্গন্ধযুক্ত চামড়া ও বর্জ্য মাটিচাপা দেওয়া বা নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দামের অস্থিরতা নিয়ে বিতর্ক
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে চামড়ার প্রকৃত দাম নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলছেন ১৫০ থেকে ৬০০ টাকায় চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে, আবার শ্রমিকদের দাবি অধিকাংশ চামড়ার দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
সিলেটের বালাগঞ্জ থেকে আসা এক ক্রেতা জানান, তিনি কয়েক হাজার টাকা খরচ করে চামড়া কিনেছেন, কিন্তু পরে ক্রেতারা খুব কম দাম প্রস্তাব করায় বিপাকে পড়েছেন। ফলে চামড়াগুলো কীভাবে ব্যবস্থাপনা করবেন, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
শ্রমিকদের ব্যস্ততা, বাড়তি আয়
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চামড়া থেকে মাংস আলাদা করা, পরিষ্কার করা এবং লবণ লাগানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। এসব কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এক হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। কেউ কেউ চামড়া থেকে আলাদা করা মাংস নেওয়ার শর্তে কাজ করছেন এবং পরে সেই মাংস বাজারে বিক্রি করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, একসময় বালিকান্দিতে সারা বছর কয়েক ডজন ব্যবসায়ী সক্রিয় থাকলেও এখন হাতে গোনা কয়েকজন স্থায়ীভাবে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন। চামড়ার বাজারে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে ঐতিহ্যবাহী এ খাত ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
ঈদের চামড়া বিক্রি না হওয়ায় মৌলভীবাজারে সংকট, লবণের ঘাটতি ও বাজার ধসের কারণে অনেকেই চামড়া মাটিচাপা বা নদীতে ফেলার পথে।
ঈদের চামড়া সংকট
মৌলভীবাজারে কোরবানির চামড়ার বাজারে আবারও সংকট। বিক্রি না হওয়া চামড়া মাটিচাপা ও নদীতে ফেলার আশঙ্কার পাশাপাশি লবণের ঘাটতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিস্তারিত পড়ুন।
#ঈদেরচামড়া #কোরবানি #মৌলভীবাজার #চামড়াবাজার #চামড়াশিল্প #বাংলাদেশঅর্থনীতি #ট্যানারি #ঈদুলআজহা #চামড়াসংকট #বাংলাদেশসংবাদ
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















