কোনো রাষ্ট্র নিজেকে কী নামে পরিচয় করায়, তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য কী বাস্তবতা তৈরি করে। একটি দেশের সংবিধানে ইসলাম, গণতন্ত্র, বিপ্লব বা জাতীয়তাবাদের যে পরিচয়ই লেখা থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার সাফল্য মাপা হয় মানুষের জীবনমান, সুযোগের বিস্তার, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মাধ্যমে।
আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তান—এই তিনটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে ইসলামের ধারণাকে স্থান দিয়েছে। কিন্তু কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা দেখায়, একই ধর্মীয় পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাদের উন্নয়নের পথ ও ফলাফল একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই বৈপরীত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: রাষ্ট্রের ইসলামী পরিচয় কি নিজেই উন্নয়ন নিশ্চিত করে, নাকি উন্নয়নের জন্য আরও গভীর কিছু শর্ত প্রয়োজন?
আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক। দীর্ঘ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশি হস্তক্ষেপ দেশটিকে দুর্বল করেছে—এ কথা সত্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে নীতিগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশেষত নারীশিক্ষা ও নারীর কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ শুধু মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপরও সরাসরি আঘাত।
যে সমাজ তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখে, সে সমাজ দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ হতে পারে না। দক্ষ জনশক্তির অভাব, শিক্ষিত মানুষের দেশত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আফগানিস্তানের উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি ঘটলেও তা অর্থনৈতিক গতিশীলতায় রূপান্তরিত হয়নি। ফলে দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও দেশটি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
ইরানের উদাহরণ দেখায়, একটি রাষ্ট্র বাইরের চাপের মুখেও যদি জ্ঞান, গবেষণা এবং শিল্পায়নকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে স্বনির্ভরতার ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তাদের অবদান প্রমাণ করে যে আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও ইসলামী পরিচয় পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং উন্নয়নের জন্য এই দুইয়ের সমন্বয় অপরিহার্য।
তবে ইরানের গল্পও নিখুঁত সাফল্যের নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সেখানে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ বিজ্ঞান ও শিল্পে অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও নাগরিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন উপেক্ষা করলে তা দীর্ঘমেয়াদে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
পাকিস্তানের অবস্থান এই দুই অভিজ্ঞতার মাঝামাঝি। স্বাধীনতার পর কয়েক দশক দেশটি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং সীমিত গোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো সেই অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দেয়। অর্থনীতি বেড়েছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বিস্তৃত অংশে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে উৎপাদনশীলতা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য এবং জলবায়ু ঝুঁকি দেশটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সত্যকে স্পষ্ট করে। কোনো রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়ভিত্তিক, দক্ষ বা সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করে না। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদে বিনিয়োগ, জবাবদিহিমূলক শাসন, নারী-পুরুষের সমান সুযোগ এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
ইসলামের নৈতিক শিক্ষা ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, জ্ঞানার্জন এবং সামাজিক কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। ফলে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের সাফল্য বিচার করতে হলে তার রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং দেখতে হবে সে কতটা দারিদ্র্য কমাতে পেরেছে, কতজন শিশুকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতে পেরেছে, নারীদের জন্য কতটা সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং নাগরিকদের জন্য কতটা মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করেছে।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পরিচয় নয়, রাষ্ট্রের কর্মই তার বৈধতার ভিত্তি। জনগণের জীবনমান উন্নত না হলে ধর্মীয় প্রতীক ও রাজনৈতিক ভাষ্য কেবল বাহ্যিক আবরণে পরিণত হয়। আর যখন শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তখনই একটি রাষ্ট্র তার ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার সেতুবন্ধন ঘটাতে সক্ষম হয়।
ইশরাত হুসাইন 


















