০৮:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬
যখন ঢাকা ঘুমায়: অস্থির পৃথিবীর মাঝে এক বিরল বিরতি আমাদের খাবারের পেছনের নৈতিক প্রশ্ন ঈদের চামড়ায় ধস: বিক্রি না হওয়ায় মাটিচাপা, নদীতে ভাসানোর আশঙ্কা ডিম-পাথর-জুতা নিক্ষেপ: পশ্চিমবঙ্গের সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার অভিযোগ ইসলামী রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা: স্লোগান নয়, মানুষের জীবন নতুন যুদ্ধের মুখ: ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর অচলাবস্থার যুগে বিশ্ব সংঘাতের নতুন বাস্তবতা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ঘিরে তেহরানে রক্ষণশীলদের চাপ গিলগিট-বালতিস্তানে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে পিটিআই নেতাদের বহিষ্কার, বিতর্কে নির্বাচনী পরিবেশ ঈদের উৎসব নয়, হাসপাতালের শয্যায় লড়াই হামে উদ্বেগ বাড়ছে: ছুটির মধ্যেও দিনে আক্রান্ত ১,০০০-এর বেশি, ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৮ শিশুর

যখন ঢাকা ঘুমায়: অস্থির পৃথিবীর মাঝে এক বিরল বিরতি

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী কখনো ঘুমায় না।

নিউইয়র্কের আর্থিক বাজার বন্ধ হলে টোকিও জেগে ওঠে। লন্ডনের অফিস শেষ হওয়ার আগেই সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেইজিং, দুবাই, মুম্বাই, প্যারিস কিংবা ইস্তাম্বুল—আধুনিক বিশ্বের বড় শহরগুলো এখন একটি অবিরাম চক্রের অংশ। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং তথ্যপ্রবাহের এই যুগে শহর মানেই গতি। শহর মানেই কাজ। শহর মানেই কখনো না থামা।

এই পৃথিবীতে রাজধানীগুলো যেন জাতির স্পন্দিত হৃদপিণ্ড। সেগুলো থেমে গেলে যেন পুরো দেশ থেমে যায়।

কিন্তু বছরে দুবার, ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে, ঢাকা এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে।

যে শহরে প্রতিদিন দুই কোটিরও বেশি মানুষের জীবন প্রবাহিত হয়, যে শহরের রাস্তায় সকাল শুরু হয় হর্নের শব্দে এবং রাত শেষ হয় ক্লান্ত যানজটের মধ্যে, সেই ঢাকা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত নগরীগুলোর একটি কয়েক দিনের জন্য গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।

বিশ্ব তখনও অস্থির।

কোথাও যুদ্ধের দামামা বাজছে। কোথাও জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ। কোথাও মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা করছে শেয়ারের সূচক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে কর্মসংস্থানের চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা। সংবাদমাধ্যমের পর্দা জুড়ে একের পর এক সংকটের খবর।

আর সেই সময়েই ঢাকা যেন নিজেকে সাময়িকভাবে পৃথিবীর এই উন্মত্ত গতি থেকে সরিয়ে নেয়।

ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম সামাজিক পুনর্মিলন। বছরের পর বছর রাজধানীতে কাজ করা লাখো মানুষ পরিবারের কাছে ফিরে যায়। ট্রেন, বাস, লঞ্চ আর মহাসড়ক ধরে শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মৌসুমি জনস্রোত। কয়েক দিনের জন্য ঢাকা তার মানুষদের গ্রামে, মফস্বলে এবং জেলার শহরগুলোতে ফিরিয়ে দেয়।

ফলে রাজধানী ধীরে ধীরে খালি হতে শুরু করে।

মতিঝিলের ব্যস্ত সড়ক, গুলশানের করপোরেট ভবন, কারওয়ান বাজারের কর্মচাঞ্চল্য কিংবা ধানমন্ডির ব্যস্ত মোড়—সবকিছু যেন একসঙ্গে নিঃশব্দ হয়ে আসে। শহরের কংক্রিটের শরীর তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের ব্যস্ত আত্মাটি যেন ছুটিতে চলে যায়।

ঈদের ছুটির সকালে ঢাকাকে দেখলে মনে হয়, শহরটি যেন নিজের সঙ্গে কথা বলছে।

খালি রাস্তায় রোদ পড়ে থাকে। উড়ালসড়কগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা। বাতাসে নেই প্রতিযোগিতা, নেই তাড়া। বছরের অন্য সময় যে দূরত্ব অতিক্রম করতে এক ঘণ্টা লাগে, তা কয়েক মিনিটে পেরিয়ে যাওয়া যায়। যেন শহর তার প্রকৃত ভৌগোলিক আকারটি আবার ফিরে পায়।

রাতের দৃশ্য আরও বিস্ময়কর।

বিশ্বের অধিকাংশ মহানগর রাতেও আলোকোজ্জ্বল এবং কর্মব্যস্ত থাকে। নিউইয়র্ককে বলা হয় ‘দ্য সিটি দ্যাট নেভার স্লিপস’। টোকিওর ট্রেন গভীর রাত পর্যন্ত চলাচল করে। দুবাইয়ের আকাশচুম্বী ভবনগুলো রাতেও আলোয় ঝলমল করে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে ঢাকা যেন তার উল্টো চরিত্র প্রকাশ করে। শহরটি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ে।

সেই ঘুমের মধ্যে এক ধরনের নান্দনিকতা আছে।

শহরের শব্দ কমে গেলে আমরা পাখির ডাক শুনতে পাই। দ্রুতগতির জীবনের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা নীরবতাকে অনুভব করতে পারি। আমরা বুঝতে পারি, একটি শহর কেবল ভবন, সড়ক আর যানবাহনের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের উপস্থিতি, স্মৃতি, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের সমন্বয়ে তৈরি একটি জীবন্ত সত্তা।

ঈদের ঢাকা তাই কেবল ফাঁকা ঢাকা নয়। এটি একটি বিরল সামাজিক মুহূর্ত, যখন একটি রাজধানী তার নাগরিকদের পরিবারে ফেরত পাঠিয়ে নিজেও বিশ্রাম নেয়।

হয়তো এ কারণেই ঈদের ছুটির এই কয়েক দিন এত আকর্ষণীয়। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধুনিকতার অর্থ শুধু গতি নয়, থেমে যাওয়ার ক্ষমতাও। উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজন সম্পর্ক, উৎসব, স্মৃতি এবং বিশ্রাম।

অস্থির, উদ্বিগ্ন এবং ক্রমাগত ব্যস্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীতে ঈদের ছুটির ঢাকা তাই এক অনন্য দৃশ্য। এটি এমন একটি রাজধানী, যা কয়েক দিনের জন্য নিজের হৃদস্পন্দন ধীর করে দেয়। এমন একটি মহানগর, যা আমাদের শেখায়—কখনো কখনো থেমে যাওয়াও জীবনের অংশ।

আর যখন ঢাকা ঘুমায়, তখন শুধু একটি শহর বিশ্রাম নেয় না; বিশ্রাম নেয় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোটি মানুষের ক্লান্তিও।

জনপ্রিয় সংবাদ

যখন ঢাকা ঘুমায়: অস্থির পৃথিবীর মাঝে এক বিরল বিরতি

যখন ঢাকা ঘুমায়: অস্থির পৃথিবীর মাঝে এক বিরল বিরতি

০৮:৪২:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী কখনো ঘুমায় না।

নিউইয়র্কের আর্থিক বাজার বন্ধ হলে টোকিও জেগে ওঠে। লন্ডনের অফিস শেষ হওয়ার আগেই সিঙ্গাপুরের বন্দর ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেইজিং, দুবাই, মুম্বাই, প্যারিস কিংবা ইস্তাম্বুল—আধুনিক বিশ্বের বড় শহরগুলো এখন একটি অবিরাম চক্রের অংশ। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং তথ্যপ্রবাহের এই যুগে শহর মানেই গতি। শহর মানেই কাজ। শহর মানেই কখনো না থামা।

এই পৃথিবীতে রাজধানীগুলো যেন জাতির স্পন্দিত হৃদপিণ্ড। সেগুলো থেমে গেলে যেন পুরো দেশ থেমে যায়।

কিন্তু বছরে দুবার, ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে, ঢাকা এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম হয়ে ওঠে।

যে শহরে প্রতিদিন দুই কোটিরও বেশি মানুষের জীবন প্রবাহিত হয়, যে শহরের রাস্তায় সকাল শুরু হয় হর্নের শব্দে এবং রাত শেষ হয় ক্লান্ত যানজটের মধ্যে, সেই ঢাকা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত নগরীগুলোর একটি কয়েক দিনের জন্য গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।

বিশ্ব তখনও অস্থির।

কোথাও যুদ্ধের দামামা বাজছে। কোথাও জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ। কোথাও মূল্যস্ফীতি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ওঠানামা করছে শেয়ারের সূচক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বদলে দিচ্ছে কর্মসংস্থানের চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা। সংবাদমাধ্যমের পর্দা জুড়ে একের পর এক সংকটের খবর।

আর সেই সময়েই ঢাকা যেন নিজেকে সাময়িকভাবে পৃথিবীর এই উন্মত্ত গতি থেকে সরিয়ে নেয়।

ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম সামাজিক পুনর্মিলন। বছরের পর বছর রাজধানীতে কাজ করা লাখো মানুষ পরিবারের কাছে ফিরে যায়। ট্রেন, বাস, লঞ্চ আর মহাসড়ক ধরে শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মৌসুমি জনস্রোত। কয়েক দিনের জন্য ঢাকা তার মানুষদের গ্রামে, মফস্বলে এবং জেলার শহরগুলোতে ফিরিয়ে দেয়।

ফলে রাজধানী ধীরে ধীরে খালি হতে শুরু করে।

মতিঝিলের ব্যস্ত সড়ক, গুলশানের করপোরেট ভবন, কারওয়ান বাজারের কর্মচাঞ্চল্য কিংবা ধানমন্ডির ব্যস্ত মোড়—সবকিছু যেন একসঙ্গে নিঃশব্দ হয়ে আসে। শহরের কংক্রিটের শরীর তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের ব্যস্ত আত্মাটি যেন ছুটিতে চলে যায়।

ঈদের ছুটির সকালে ঢাকাকে দেখলে মনে হয়, শহরটি যেন নিজের সঙ্গে কথা বলছে।

খালি রাস্তায় রোদ পড়ে থাকে। উড়ালসড়কগুলো অস্বাভাবিকভাবে ফাঁকা। বাতাসে নেই প্রতিযোগিতা, নেই তাড়া। বছরের অন্য সময় যে দূরত্ব অতিক্রম করতে এক ঘণ্টা লাগে, তা কয়েক মিনিটে পেরিয়ে যাওয়া যায়। যেন শহর তার প্রকৃত ভৌগোলিক আকারটি আবার ফিরে পায়।

রাতের দৃশ্য আরও বিস্ময়কর।

বিশ্বের অধিকাংশ মহানগর রাতেও আলোকোজ্জ্বল এবং কর্মব্যস্ত থাকে। নিউইয়র্ককে বলা হয় ‘দ্য সিটি দ্যাট নেভার স্লিপস’। টোকিওর ট্রেন গভীর রাত পর্যন্ত চলাচল করে। দুবাইয়ের আকাশচুম্বী ভবনগুলো রাতেও আলোয় ঝলমল করে। কিন্তু ঈদের ছুটিতে ঢাকা যেন তার উল্টো চরিত্র প্রকাশ করে। শহরটি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ে।

সেই ঘুমের মধ্যে এক ধরনের নান্দনিকতা আছে।

শহরের শব্দ কমে গেলে আমরা পাখির ডাক শুনতে পাই। দ্রুতগতির জীবনের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা নীরবতাকে অনুভব করতে পারি। আমরা বুঝতে পারি, একটি শহর কেবল ভবন, সড়ক আর যানবাহনের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের উপস্থিতি, স্মৃতি, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনের সমন্বয়ে তৈরি একটি জীবন্ত সত্তা।

ঈদের ঢাকা তাই কেবল ফাঁকা ঢাকা নয়। এটি একটি বিরল সামাজিক মুহূর্ত, যখন একটি রাজধানী তার নাগরিকদের পরিবারে ফেরত পাঠিয়ে নিজেও বিশ্রাম নেয়।

হয়তো এ কারণেই ঈদের ছুটির এই কয়েক দিন এত আকর্ষণীয়। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধুনিকতার অর্থ শুধু গতি নয়, থেমে যাওয়ার ক্ষমতাও। উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজন সম্পর্ক, উৎসব, স্মৃতি এবং বিশ্রাম।

অস্থির, উদ্বিগ্ন এবং ক্রমাগত ব্যস্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীতে ঈদের ছুটির ঢাকা তাই এক অনন্য দৃশ্য। এটি এমন একটি রাজধানী, যা কয়েক দিনের জন্য নিজের হৃদস্পন্দন ধীর করে দেয়। এমন একটি মহানগর, যা আমাদের শেখায়—কখনো কখনো থেমে যাওয়াও জীবনের অংশ।

আর যখন ঢাকা ঘুমায়, তখন শুধু একটি শহর বিশ্রাম নেয় না; বিশ্রাম নেয় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোটি মানুষের ক্লান্তিও।