বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু যুদ্ধ জয়ের পথ যেন আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠছে। আধুনিক প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হামলার সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দিলেও তা দ্রুত ও নির্ণায়ক বিজয় নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘাত দেখাচ্ছে, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
ড্রোনের ছায়ায় যুদ্ধক্ষেত্র
ইউক্রেনের যুদ্ধ আধুনিক যুদ্ধের এক নতুন চিত্র তুলে ধরেছে। ছোট, সস্তা এবং ব্যাপক উৎপাদনযোগ্য ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলোর একটি। এগুলো শুধু হামলাই চালায় না, নজরদারি, সরবরাহ পৌঁছে দেওয়া এবং আহতদের সরিয়ে নেওয়ার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর প্রায় স্থায়ী নজরদারি থাকায় সেনাদের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে কয়েক কিলোমিটার এলাকা ছিল বিপজ্জনক, এখন সেই প্রাণঘাতী অঞ্চল অনেক বেশি বিস্তৃত। ফলে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই যুদ্ধ স্থবির অবস্থায় আটকে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি বাড়লেও বিজয় কেন কঠিন
অনেক সামরিক বিশ্লেষক মনে করেন, উন্নত সেন্সর, নির্ভুল অস্ত্র এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা প্রতিরক্ষাকারীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ফলে আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য দ্রুত সাফল্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
তবে প্রযুক্তির এই প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, নতুন অস্ত্রের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। যেমন ড্রোনের বিরুদ্ধে জ্যামিং প্রযুক্তি, লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা এবং অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দ্রুত উন্নত হচ্ছে। তাই প্রযুক্তিগত সুবিধা স্থায়ী নয়; এটি এক ধরনের অবিরাম প্রতিযোগিতা।
আকাশে আধিপত্য, মাটিতে অচলাবস্থা
একসময় ধারণা ছিল আকাশের নিয়ন্ত্রণ মানেই যুদ্ধ জয়ের পথে বড় অগ্রগতি। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
উন্নত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সাহায্যে আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও মাটিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এখনও কঠিন। কারণ নিচু উচ্চতায় পরিচালিত ড্রোন এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রকে জটিল করে তুলেছে। ফলে শুধু বিমান হামলা দিয়ে রাজনৈতিক বা সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা সবসময় সম্ভব হচ্ছে না।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কি মানবহীন?
বিশ্বের বিভিন্ন সামরিক বাহিনী এখন মানবহীন যান, রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভবিষ্যতের সেনাবাহিনীতে মানুষের ভূমিকা কমে গিয়ে স্বয়ংক্রিয় ও দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার গুরুত্ব বাড়বে।
তবে ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা প্রচলিত অস্ত্রের যুগ একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বরং আধুনিক বাহিনী এখন এমন এক মিশ্র মডেলের দিকে এগোচ্ছে যেখানে উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রচলিত সামরিক শক্তি একসঙ্গে কাজ করবে।

বাড়ছে সংঘাত, বাড়ছে ঝুঁকি
বিশ্বে সক্রিয় রাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাতের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনাও বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংকট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রযুক্তি যুদ্ধকে আরও নিখুঁত করলেও রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল হিসাবের ঝুঁকি কমায় না। বরং অনেক নেতা এখনও বিশ্বাস করেন যে নতুন প্রযুক্তি তাদের দ্রুত বিজয় এনে দেবে। বাস্তবতা বলছে, সেই বিশ্বাস প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।
প্রযুক্তি নয়, কৌশলই শেষ কথা
আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই সবকিছু নয়। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সেন্সর কিংবা নির্ভুল অস্ত্র যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে, কিন্তু এগুলো একাই বিজয় নিশ্চিত করতে পারে না।
ইতিহাস যেমন দেখিয়েছে, তেমনি বর্তমান যুদ্ধগুলোও প্রমাণ করছে যে প্রযুক্তির পাশাপাশি কৌশল, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যই শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে। আর সেই কারণেই বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সংঘাতগুলো আরও বেশি অনিশ্চিত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















