মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট নতুন জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর জন্য ব্যয়সংক্রান্ত নিয়ম শিথিল করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। একের পর এক সংকটের কারণে আর্থিক চাপে থাকা দেশগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত সদস্য দেশগুলোর আর্থিক অবস্থার মূল্যায়নে ইইউ জানিয়েছে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সামাল দিতে নির্দিষ্ট খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বুলগেরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে আর্থিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
জ্বালানি সংকটে বিশেষ ছাড়
ইইউর বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কোনো সদস্য দেশের বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারি এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের সময় এই নিয়ম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে সংস্কার করা নতুন আর্থিক নিয়ম কার্যকর হলেও এবার মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে আবারও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সদস্য দেশগুলোকে কিছু নমনীয়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্রাসেলস।
ইইউর অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিশনার ভালদিস ডোমব্রোভস্কিস বলেন, জ্বালানি সংকট প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। তাই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে নেওয়া পদক্ষেপে সদস্য দেশগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ দেওয়া হবে।
নতুন ব্যবস্থায় দেশগুলো ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর জিডিপির সর্বোচ্চ ০.৩ শতাংশ এবং মোট ০.৬ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় করতে পারবে। তবে জ্বালানির ওপর কর কমানোর মতো পদক্ষেপ এই ছাড়ের আওতায় পড়বে না।
ইতালির অবস্থার উন্নতির ইঙ্গিত
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি-সংকট সংশ্লিষ্ট ব্যয়কে বিশেষ ছাড়ের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
ইউরোপীয় কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইতালির বাজেট ঘাটতি ২০২৬ ও ২০২৭ সালে ২.৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। যদিও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ায় ২০২৫ সালেই ঘাটতি ৩ শতাংশের নিচে নামানোর আশা পূরণ হয়নি।
বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
ইউরোজোনে যোগদানের কয়েক মাসের মধ্যেই বুলগেরিয়াকে অতিরিক্ত বাজেট ঘাটতির জন্য সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন।
কমিশনের মতে, বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে ‘এক্সেসিভ ডেফিসিট প্রসিডিউর’ চালু করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এর ফলে দেশটিকে কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে ঘাটতি কমানোর পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে দেখা গেছে, দেশটির বাজেট ঘাটতি ২০২৫ সালের ৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে চলতি বছরে ৪.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
জার্মানির জন্য প্রতিরক্ষা ব্যয়ের সুবিধা
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার পক্ষে অবস্থান নিলেও এ বছর তাদের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৭ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বছর তা বেড়ে ৪.১ শতাংশ হতে পারে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কারণে জার্মানি ইইউর বিশেষ ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়লে ২০২৬ সালে জার্মানির ঘাটতি ২.৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকত।
ফ্রান্সের উদ্বেগ বাড়ছে
ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি এখনও ইইউর অন্যতম বড় উদ্বেগের কারণ। দেশটি চলতি বছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
কমিশন জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫.৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ঘাটতি ৫.১ শতাংশে নামতে পারে। তবে নীতিতে পরিবর্তন না এলে ২০২৭ সালে ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি ৫.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা তখন ইইউর মধ্যে সর্বোচ্চ হবে।
একই সঙ্গে দেশটির সরকারি ঋণ আগামী বছর জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ ইইউর নিয়ম অনুযায়ী এই হার ৬০ শতাংশের নিচে থাকার কথা।
মাল্টার জন্য সুসংবাদ
অন্যদিকে মাল্টা আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে ইইউর অতিরিক্ত ঘাটতির তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পথে রয়েছে। কমিশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দেশটির বাজেট ঘাটতি ২.২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইইউর জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যয়বিধি শিথিলের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন যুদ্ধ, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















