বছরের পর বছর ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কোথায় রাখা হয়েছে এবং তা কতটা নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সারাক্ষণ রিপোর্ট।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সেই লক্ষ্য পূরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের হাতে থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম থেকে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো উপাদান পাওয়া সম্ভব।
কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, ইরান যদি তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও সংশ্লিষ্ট পারমাণবিক কার্যক্রম পরিত্যাগে সম্মত হয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পথ তৈরি হতে পারে। ওয়াশিংটন এখন সামরিক অভিযানের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ইরানের কাছে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। এই উপাদান সাধারণত বিশেষ কন্টেইনারে সংরক্ষণ করা হয়, ফলে তা একাধিক স্থানে ভাগ করে রাখার সুযোগ থাকে।
ইসফাহান: সবচেয়ে সম্ভাব্য গোপন ভাণ্ডার
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসির মতে, ইরানের অধিকাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্ভবত ইসফাহানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সের গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই কমপ্লেক্স একটি পাহাড়ের গভীরে নির্মিত হওয়ায় শক্তিশালী বাঙ্কার-ধ্বংসকারী বোমাও সেখানে পৌঁছাতে নাও পারে। ২০২৫ সালের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় টানেলের প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরে সেখানে পুনরায় সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রবেশপথের কাছে মাটির বাঁধ ও নতুন কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য স্থল অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হতে পারে। কিছু বিশ্লেষক আরও মনে করেন, অতীতে পারমাণবিক উপাদান বহনের জন্য ব্যবহৃত কন্টেইনারসদৃশ মালামাল ওই এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছিল।

নাতাঞ্জ ও পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের রহস্য
ইরানের বৃহত্তম ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জেও কিছু পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
২০২৫ ও পরবর্তী সময়ে একাধিক বিমান হামলায় এই স্থাপনাটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। তবে সেখানে থাকা সম্ভাব্য ইউরেনিয়ামের ভাগ্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই।
নাতাঞ্জের কাছেই অবস্থিত পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামের আরেকটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনাও আন্তর্জাতিক নজরে রয়েছে। ২০২০ সাল থেকে সেখানে নির্মাণকাজ চলেছে বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, এলাকাটির চারপাশে নিরাপত্তা প্রাচীর নির্মাণ এবং প্রবেশপথ আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
ফোরদোতে ধ্বংসস্তূপের নিচে কী আছে?
ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাটি ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলায় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক চিত্রে দেখা গেছে, সেখানে টানেলমুখী সড়কে নতুন বাধা স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যৎ হামলা বা অনুপ্রবেশ ধীর করার উদ্দেশ্যে করা হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউরেনিয়ামের একটি অংশ এমন কোনো অঘোষিত স্থাপনাতেও থাকতে পারে, যার অস্তিত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এখনও অজানা। এমন হলে ওই মজুত উদ্ধার বা নিষ্ক্রিয় করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
কত বড় ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার?
উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বাইরে ইরানের মোট সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশটির কাছে মোট প্রায় ১৯ হাজার ৯৩০ পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪০৫ পাউন্ড এবং ৫ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ১৩ হাজার ২৮০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন ইরানের কার্যকর সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো থাকবে, ততদিন এই মজুতকে আরও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করার সক্ষমতাও দেশটির হাতে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















