০৬:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬
দুবাইয়ের আসল শক্তি করছাড় নয়, আস্থার প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক গ্যাসের দামে বড় স্বস্তি, তবে বেড়েছে বিমান জ্বালানির দাম হাম ভাইরাসে জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ মেলেনি, টিকার সুরক্ষা এখনও কার্যকর: আইসিডিডিআর,বি আগুনের বিরুদ্ধে ইউরোপের নতুন ‘নীরব সেনা’—বন রক্ষায় গাধার অভিনব ব্যবহার হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮৪৪ ‘তেলাপোকা’ থেকে তুমুল গণজাগরণ: তিন তরুণের হাত ধরে কাঁপল ভারতের ছাত্র আন্দোলন প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ভারতের নতুন আইন: তদন্ত ৬০ দিনে, বিচার তিন মাসে, শাস্তি আরও কঠোর ভূমধ্যসাগরের ঢেউ পেরিয়ে সেউতায় হাজারো মানুষের মরিয়া ছুটে চলা, অভিবাসন সংকটে চাপে স্পেন যুদ্ধের ক্ষত, নেতৃত্বের সংকট এবং ইসরায়েলের নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ রোগনির্ণয়ের যুগে আমরা কি অতিরিক্ত লেবেল দিচ্ছি?

যুদ্ধের ক্ষত, নেতৃত্বের সংকট এবং ইসরায়েলের নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ

দক্ষিণ ইসরায়েলের সীমান্তঘেঁষা একটি উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে গাজার ধ্বংসস্তূপ দেখার জন্য মানুষের ভিড়—এই দৃশ্য শুধু যুদ্ধের নির্মমতাকেই তুলে ধরে না, বরং একটি সমাজের মানসিক অবস্থাকেও প্রকাশ করে। যেখানে ধ্বংসকে কেউ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মনে করছে, আবার কেউ একই দৃশ্য দেখে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক খুঁজে পাচ্ছে। গাজার যুদ্ধ আজ আর কেবল সামরিক সংঘাতের গল্প নয়; এটি ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, গণতন্ত্র এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে গভীর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। সেই ঘটনার পর গাজায় যে সামরিক অভিযান শুরু হয়, তা বহু বছর ধরে চলমান সংঘাতকে আরও বিধ্বংসী রূপ দেয়। বিপুল প্রাণহানি, ব্যাপক অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং মানবিক সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধটি ইসরায়েলের ভেতরেও একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—এই যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী ছিল, আর সেটি আদৌ অর্জিত হয়েছে কি?

এই প্রশ্নটিই এখন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এই নেতা এখনও নিজেকে জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র নির্ভরযোগ্য রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চান। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা এবং রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ক্ষয় করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের আবির্ভাব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কেবল একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নন; যুদ্ধের ব্যক্তিগত মূল্যও তিনি দিয়েছেন। গাজায় তাঁর ছেলে নিহত হয়েছে, পরিবারের আরও সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান শুধু কৌশলগত সমালোচনা নয়, ব্যক্তিগত ত্যাগের অভিজ্ঞতা থেকেও গড়ে উঠেছে। তিনি যুদ্ধ থামানোর পক্ষে নন; বরং তাঁর যুক্তি হলো, সামরিক শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি রাজনৈতিক লক্ষ্য, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আইজেনকটের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক দাবি—৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিশন গঠন। তাঁর মতে, এই ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ছায়া থেকে যাবে। একই সঙ্গে তিনি বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবায় বৈষম্য দূর করার কথাও বলছেন, যা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সামাজিক বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

The best show in town': From a hilltop in Israel, observers have a sinister  view of Gaza bombings

তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়লেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতা সহজ নয়। দেশটির ভোটার সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত। কেউ মনে করেন, এত বড় নিরাপত্তা বিপর্যয়ের পর নেতৃত্ব বদল অপরিহার্য। আবার অন্যদের বিশ্বাস, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে নির্বাচনী লড়াইটি কেবল দুই ব্যক্তির প্রতিযোগিতা নয়; এটি নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে এক বিস্তৃত রাজনৈতিক সংগ্রাম।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। বিরোধী রাজনীতির বড় অংশও ফিলিস্তিন প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে অনাগ্রহী। গাজার যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর কৌশল সমালোচিত হলেও অধিকাংশ বিকল্প নেতৃত্বও ফিলিস্তিন ইস্যুতে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। ফলে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও সংঘাতের কাঠামোগত কারণগুলো কতটা বদলাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নেতানিয়াহুর জন্য এই নির্বাচন ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা হারালে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির মামলাগুলো আবারও পূর্ণ গতিতে এগোতে পারে। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা এখনও তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি কঠিন সময়ে দেশকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম। এই দ্বৈত বাস্তবতাই নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

গাজার ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষের চোখে যে আবেগ দেখা যায়, সেটি আসলে ইসরায়েলের বর্তমান রাজনীতিরও প্রতিচ্ছবি। একদিকে নিরাপত্তাহীনতার গভীর স্মৃতি, অন্যদিকে যুদ্ধের অবসানহীন মূল্য। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশটি এমন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, যা শুধু পরবর্তী সরকার নির্ধারণ করবে না; বরং নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রটি ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক ও নৈতিক পথ বেছে নেবে। যুদ্ধের ফলাফল শুধু সীমান্তে নয়, ভোটের বাক্সেও নির্ধারিত হতে চলেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দুবাইয়ের আসল শক্তি করছাড় নয়, আস্থার প্রতিষ্ঠান

যুদ্ধের ক্ষত, নেতৃত্বের সংকট এবং ইসরায়েলের নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ

০৫:১৫:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

দক্ষিণ ইসরায়েলের সীমান্তঘেঁষা একটি উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে দূরবীন দিয়ে গাজার ধ্বংসস্তূপ দেখার জন্য মানুষের ভিড়—এই দৃশ্য শুধু যুদ্ধের নির্মমতাকেই তুলে ধরে না, বরং একটি সমাজের মানসিক অবস্থাকেও প্রকাশ করে। যেখানে ধ্বংসকে কেউ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মনে করছে, আবার কেউ একই দৃশ্য দেখে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক খুঁজে পাচ্ছে। গাজার যুদ্ধ আজ আর কেবল সামরিক সংঘাতের গল্প নয়; এটি ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, গণতন্ত্র এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে গভীর বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। সেই ঘটনার পর গাজায় যে সামরিক অভিযান শুরু হয়, তা বহু বছর ধরে চলমান সংঘাতকে আরও বিধ্বংসী রূপ দেয়। বিপুল প্রাণহানি, ব্যাপক অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং মানবিক সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধটি ইসরায়েলের ভেতরেও একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—এই যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী ছিল, আর সেটি আদৌ অর্জিত হয়েছে কি?

এই প্রশ্নটিই এখন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা এই নেতা এখনও নিজেকে জাতীয় নিরাপত্তার একমাত্র নির্ভরযোগ্য রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চান। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা এবং রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ক্ষয় করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের আবির্ভাব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কেবল একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নন; যুদ্ধের ব্যক্তিগত মূল্যও তিনি দিয়েছেন। গাজায় তাঁর ছেলে নিহত হয়েছে, পরিবারের আরও সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান শুধু কৌশলগত সমালোচনা নয়, ব্যক্তিগত ত্যাগের অভিজ্ঞতা থেকেও গড়ে উঠেছে। তিনি যুদ্ধ থামানোর পক্ষে নন; বরং তাঁর যুক্তি হলো, সামরিক শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি রাজনৈতিক লক্ষ্য, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

আইজেনকটের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক দাবি—৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিশন গঠন। তাঁর মতে, এই ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ছায়া থেকে যাবে। একই সঙ্গে তিনি বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবায় বৈষম্য দূর করার কথাও বলছেন, যা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সামাজিক বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

The best show in town': From a hilltop in Israel, observers have a sinister  view of Gaza bombings

তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়লেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতা সহজ নয়। দেশটির ভোটার সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত। কেউ মনে করেন, এত বড় নিরাপত্তা বিপর্যয়ের পর নেতৃত্ব বদল অপরিহার্য। আবার অন্যদের বিশ্বাস, আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ছাড়া বিকল্প নেই। ফলে নির্বাচনী লড়াইটি কেবল দুই ব্যক্তির প্রতিযোগিতা নয়; এটি নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে এক বিস্তৃত রাজনৈতিক সংগ্রাম।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। বিরোধী রাজনীতির বড় অংশও ফিলিস্তিন প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে অনাগ্রহী। গাজার যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর কৌশল সমালোচিত হলেও অধিকাংশ বিকল্প নেতৃত্বও ফিলিস্তিন ইস্যুতে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। ফলে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও সংঘাতের কাঠামোগত কারণগুলো কতটা বদলাবে, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নেতানিয়াহুর জন্য এই নির্বাচন ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা হারালে তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির মামলাগুলো আবারও পূর্ণ গতিতে এগোতে পারে। অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা এখনও তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখেন, যিনি কঠিন সময়ে দেশকে নিরাপদ রাখতে সক্ষম। এই দ্বৈত বাস্তবতাই নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

গাজার ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষের চোখে যে আবেগ দেখা যায়, সেটি আসলে ইসরায়েলের বর্তমান রাজনীতিরও প্রতিচ্ছবি। একদিকে নিরাপত্তাহীনতার গভীর স্মৃতি, অন্যদিকে যুদ্ধের অবসানহীন মূল্য। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশটি এমন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি, যা শুধু পরবর্তী সরকার নির্ধারণ করবে না; বরং নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রটি ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক ও নৈতিক পথ বেছে নেবে। যুদ্ধের ফলাফল শুধু সীমান্তে নয়, ভোটের বাক্সেও নির্ধারিত হতে চলেছে।