ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটানোর পর স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া জিএলপি-১ভিত্তিক ওষুধগুলো এবার ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে নতুন গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের বৃহৎ সম্মেলনে উপস্থাপিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ওজেম্পিক, ওয়েগোভি ও মাউনজারোর মতো ওষুধ গ্রহণকারীদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের হার তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
গবেষণার ফলাফল কেন আলোচনায়
এ বছরের সম্মেলনে জিএলপি-১ ও ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে ৪০টিরও বেশি গবেষণা, উপস্থাপনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয়। এসব গবেষণার সামগ্রিক ফলাফল বলছে, এই ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কম দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব রোগীর ইতোমধ্যে ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে, তাদের রোগের অগ্রগতিও তুলনামূলক ধীর হতে পারে এবং চিকিৎসার ফলাফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান তথ্যগুলো মূলত পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা থেকে এসেছে। ফলে এগুলো কেবল সম্পর্ক নির্দেশ করে, সরাসরি কারণ-প্রভাব সম্পর্ক প্রমাণ করে না।
স্তন ক্যানসারে আশাব্যঞ্জক তথ্য
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ১ লাখের বেশি নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। গবেষকরা বয়স, স্থূলতা, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য ঝুঁকির বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও দেখেছেন, এই ওষুধ গ্রহণকারীদের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
আরেকটি বৃহৎ গবেষণায় ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি স্তন ক্যানসার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জিএলপি-১ গ্রহণকারী নারীদের পাঁচ বছর পর বেঁচে থাকার হার প্রায় ৯৬ শতাংশ, যেখানে একই ধরনের অন্য রোগীদের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ।

অন্যান্য ক্যানসারেও সম্ভাবনা
গবেষণাগুলো শুধু স্তন ক্যানসারেই সীমাবদ্ধ নয়। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার, তীব্র মাইলয়েড লিউকেমিয়া এবং আরও কয়েকটি ক্যানসারের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘস্থায়ী অগ্ন্যাশয় প্রদাহে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে জিএলপি-১ ব্যবহারকারীরা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশেরও বেশি কম ঝুঁকিতে ছিলেন বলে এক গবেষণায় দেখা গেছে।
অন্যদিকে তীব্র মাইলয়েড লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি প্রায় ৬৩ শতাংশ কম ছিল বলে আরেকটি গবেষণার তথ্য বলছে।
রোগের অগ্রগতি ধীর করার সম্ভাবনা
গবেষকদের আগ্রহের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর জিএলপি-১ ওষুধের সম্ভাব্য প্রভাব। লক্ষাধিক রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ফুসফুস, স্তন, কোলোরেক্টাল এবং লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে জিএলপি-১ ব্যবহারকারীরা মেটাস্ট্যাটিক বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া পর্যায়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই ওষুধের প্রদাহনাশক এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
চিকিৎসার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে
কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উন্নত পর্যায়ের ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়াতেও জিএলপি-১ ভূমিকা রাখতে পারে। মেটাস্ট্যাটিক কোলোরেক্টাল ক্যানসার এবং নন-স্মল সেল ফুসফুস ক্যানসারের রোগীদের ওপর করা গবেষণায় জিএলপি-১ গ্রহণকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার হার তুলনামূলক ভালো পাওয়া গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের জোরালো মত হলো, এই ফলাফলগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। ক্যানসার প্রতিরোধ বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারের সুপারিশ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনও নেই। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বৃহৎ পরিসরের নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















