ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সরল বিশ্বাস—যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং দেশের সম্পদ পুনর্গঠন করতে উচ্চ শুল্ক আরোপ করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, এই পথ শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বাজার যখন নীতির সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে সতর্ক সংকেত দিতে শুরু করে, তখন সেই সংকেতকে উপেক্ষা করা কোনো সরকারের জন্যই নিরাপদ নয়।
১১ মার্চের হোয়াইট হাউস সংবাদ সম্মেলনের সময় ট্রাম্প অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে সমৃদ্ধির প্রত্যাশার কথা বলেছিলেন। অথচ তার আগের দিনই নিউইয়র্কের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায় এবং নাসডাক সূচক প্রায় ৪ শতাংশ পড়ে যায়। এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প চলতি বছরে মন্দার সম্ভাবনা সম্পর্কে সরাসরি নিশ্চয়তা না দিয়ে অর্থনীতিতে একটি ‘পরিবর্তনের সময়’ আসার কথা বলেছিলেন। বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বক্তব্য ছিল উদ্বেগেরই ইঙ্গিত।
অর্থনীতির বাস্তব চিত্রও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয় জানুয়ারিতে আগের মাসের তুলনায় ০.২ শতাংশ কমেছে, যা মহামারি-পরবর্তী সময়ে বড় পতনগুলোর একটি। উৎপাদন খাতেও ফেব্রুয়ারিতে ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই সামান্য কমেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির দুই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি—ভোগ ও উৎপাদন—দুর্বল হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে।
তবে সব সূচক নেতিবাচক নয়। ফেব্রুয়ারিতে ভোক্তা মূল্যসূচক এক বছর আগের তুলনায় ২.৮ শতাংশ বেড়েছে, যা বাজারের প্রত্যাশার তুলনায় কম। একই সময়ে কৃষি ছাড়া অন্যান্য খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার। বেকারত্বের হার ৪.১ শতাংশে উঠলেও শ্রমবাজার এখনো বড় ধরনের সংকটের ছবি তুলে ধরছে না।
সমস্যা তাই কেবল শুল্কের অর্থনৈতিক প্রভাব নয়; তার চেয়েও বড় সমস্যা অনিশ্চয়তা।
শুল্কনীতির বারবার পরিবর্তন
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি কখনো কঠোর, কখনো সাময়িকভাবে স্থগিত, আবার কখনো নতুন হুমকির আকারে সামনে আসছে। ফলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারছেন না। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানি জোলির মন্তব্য—প্রতি ৩০ দিন পরপর এমন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়—এই অস্বস্তিরই প্রতিফলন।
অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার প্রভাব সরাসরি। ভবিষ্যৎ আয়, ব্যয় বা বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে আস্থা কমে গেলে পরিবারগুলো বড় কেনাকাটা পিছিয়ে দেয় এবং ব্যবসাগুলো নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করে। এর ফলে চাহিদা কমে, উৎপাদন ধীর হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হয়।
এ কারণেই ভোক্তা আস্থার সূচক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা আস্থা আগের মাসের তুলনায় সাত পয়েন্ট কমেছে, যা ২০২১ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে বড় পতন। মানুষ যখন ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ হারাতে শুরু করে, তখন সেটি শুধু একটি জরিপের সংখ্যা থাকে না; ধীরে ধীরে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তার প্রভাব পড়ে।
২০০৮ সালের আর্থিক সংকট দেখিয়েছিল, ভয় নিজেই কীভাবে অর্থনৈতিক সংকটকে তীব্র করতে পারে। তখন ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ঋণ নিয়ে উদ্বেগ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করেছিল। আতঙ্ক থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা বৃহত্তর মন্দায় রূপ নেয়। আজকের পরিস্থিতি অবশ্য একই নয়, কিন্তু অর্থনীতিতে আস্থার গুরুত্বের বিষয়টি একই রয়ে গেছে।
বাজারের ওপর রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমা
একটি সরকারের হাতে আইন প্রণয়ন, করনীতি নির্ধারণ কিংবা শুল্ক আরোপের ক্ষমতা থাকতে পারে। কিন্তু বাজারের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণের ক্ষমতা কোনো সরকারের নেই। বিনিয়োগকারী, ভোক্তা এবং ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রত্যাশা ও ঝুঁকি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন। তাদের আস্থা আদেশ দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না।
ট্রাম্প যদি শুল্ককে আমেরিকার সম্পদ পুনর্গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তবে তাঁকে একই সঙ্গে এর বিপরীত দিকটিও বিবেচনা করতে হবে। শুল্ক মূলত আমদানির ওপর আরোপিত এক ধরনের কর। এটি কিছু শিল্পকে সাময়িক সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। ফলে শুল্কের সুফল ও ক্ষতি—দুটিই হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
অর্থনীতির ইতিহাসে রাজনৈতিক ক্ষমতা বহুবার বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজারের বাস্তব সংকেতকে উপেক্ষা করে টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনের নজির খুব কম। অ্যাডাম স্মিথ ১৭৭৬ সালে ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’-এ যে নীতির কথা বলেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল শান্তি, সহনীয় করব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচারের কার্যকর প্রশাসন।
আধুনিক অর্থনীতি অবশ্যই ১৮ শতকের পৃথিবী নয়। তবু সেই মৌলিক শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক: সমৃদ্ধি শুধু সরকারের ঘোষণায় আসে না। তা তৈরি হয় আস্থা, স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ এবং মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। তাই ট্রাম্পের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাজারকে পরাজিত করা নয়; বরং এমন নীতি তৈরি করা, যাতে বাজার, ব্যবসা ও ভোক্তা—তিন পক্ষই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা ফিরে পায়।
কারণ বাজারকে অমান্য করা যায়, কিন্তু তার পরিণতি অমান্য করা যায় না।
ডোং-এ ইলবো 



















